কেরোসিন ঢেলে ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা

এবার নরসিংদীতে এক শিক্ষার্থীকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বলা হচ্ছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে নরসিংদী পৌর এলাকার বীরপুর মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে। ফুলন রানী বর্মণ (২২) নামের ওই তরুণীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এই হামলা হয়েছে বলে ধারণা করছেন ফুলনের পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সজিব রায় (২৭) নামে এক যুবককে রায়পুরা থেকে আটক করেছে পুলিশ।

এর আগে গত ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজীতে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ৬ এপ্রিল পরীক্ষার কেন্দ্রের ছাদে ডেকে নিয়ে বোরকা পরিহিত দুর্বৃত্তরা নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। পাঁচ দিনের মাথায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গত ৬ জুন রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে বোরকা পরা কয়েকজন দুর্বৃত্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়।

ফুলন বর্মণ বীরপুর এলাকার যুগেন্দ্র বর্মণের মেয়ে। গত বছর নরসিংদী উদয়ন কলেজ থেকে এইসএসসি পাস করেন তিনি। ওই বছর পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ে ভর্তি হতে না পারায় এবার ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ফুলন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে নরসিংদী মডেল থানার ওসি সৈয়দুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে ফুলন তার মামার সঙ্গে দোকানে কেক কিনতে যান। মামা কেক কিনে দিয়ে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। কেক নিয়ে বাড়ির আঙিনায় পৌঁছালে অপরিচিত দুজন যুবক হাত-মুখ চেপে ধরে ফুলনকে পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। পরে কেরোসিন ঢেলে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। পরে ফুলনকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী তপন মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ ডাক-চিৎকার শুরু হয়। তখন ঘর থেকে বের হয়ে দেখি, একটা মেয়ের শরীরে আগুন জ্বলছে। আগুন জ্বলছে আর ঘুরছে। পাশে মহিলারা দাঁড়িয়ে তা দেখছে। পরে একটি ভেজা চট নিয়ে তার শরীরে চাপা দিয়ে আগুন নেভানো হয়।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ফুলনের ভাই সুমন বর্মণ বলেন, ‘আগুন লাগানোর পর ফুলন চিৎকার করছিল। আগুনে তার মাথার সব চুল এবং শরীরের পেছনের দিকে বেশি পুড়েছে। আগুন নিভিয়ে তাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে সেখানকার ডাক্তাররা ফুলনকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আগুনে তার শরীরের ২০ শতাংশ পুড়েছে বলে চিকিৎসকরা আমাদের জানিয়েছেন।’

হামলার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফুলনের বাবা যুগেন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা আমরা নিশ্চিত না। তবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ফুলনের গায়ে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।’

মডেল থানার ওসি সৈয়দুজ্জামান জানান, ফুলনের ওপর হামলার ঘটনায় তার বাবা যুগেন্দ্র বর্মণ বাদী হয়ে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে গতকাল শুক্রবার বিকেলে একটি মামলা করেছেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রায়পুরা থেকে সজিব রায় নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে। সে শ্রীরামপুরের ননী গোপাল রায়ের ছেলে।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন বলেন, মেয়েটি কেক নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি কেরোসিনের বোতল,  দেশলাইয়ের বক্স, ভিকটিমের শরীরের ওড়না ও চুলসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক সজিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগুনে ফুলনের শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।