উন্নয়নের সঙ্গে চাই সংস্কৃতির সমৃদ্ধি

সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনই আধুনিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম মশালটা জ্বালিয়ে ছিল। বাহান্ন’র ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধিকারের আন্দোলন বেগবান হয় এবং ক্রমান্বয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতিতে স্বাধিকারের দাবি রাজনৈতিক গণজোয়ার সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আবারও স্মরণ করা প্রয়োজন এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং সাংস্কৃতিক অভিমুখ অনুধাবনের জন্য। এ কথা সর্বজনবিদিত যে সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক চৈতন্যের বিকাশের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। আজ এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, স্বাধীনতা-উত্তরকালের নানা কঠিন রাজনৈতিক পালাবদল পেরিয়ে এসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনেক সাফল্য সত্ত্বেও আজকের বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা যেন মুখ থুবড়ে পড়ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্প- সংস্কৃতির চর্চায় কাক্সিক্ষত গতি নেই; সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতাসহ নানা পশ্চাৎপদতা জেঁকে বসেছে সমাজে।  কিন্তু এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।  যার ফল দেখা যাচ্ছে সমাজের সার্বিক সামাজিক-সংস্কৃতির অনগ্রসরতায়, মানবিক প্রগতির পশ্চাৎপদতায়।   

 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গতিধারা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশের এখন অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি মানবিক প্রগতি অর্জন করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই কাজটি করতে হলে অবশ্যই সমাজের বিপুল অংশের মানুষের মধ্যে কতগুলো সাধারণ মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এ জন্য সমাজে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাকাঠামোর সংস্কার এবং সাংস্কৃতিক চেতনার মানোন্নয়নে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। কিন্তু

সংস্কৃতির এমন সমৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের সরকার কতটা সচেতন সেই প্রশ্ন ওঠা অসংগত নয়।    

 

জাতীয় সংসদে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সাংস্কৃতিক খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ নিয়ে

সংস্কৃতি অঙ্গন এবং সচেতন নাগরিকদের হতাশা ও ক্ষোভের মধ্য দিয়ে দেশের

সাংস্কৃতিক উন্নয়নে সরকারের উদাসীনতার প্রশ্নটি আবারও সামনে উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকা। এই বাজেট দেশের সংস্কৃতিচর্চার জন্য মোটেও সন্তোষজনক নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। 

 

আগামী অর্থবছরে খাতভিত্তিক সম্পদ বণ্টনকালে তথ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং যুব ও ক্রীড়া এই চারটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ‘বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম’ খাত হিসেবে বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। তুলনা করলে দেখা যাবে এই খাতের অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে তা কমেছে।  ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৫১০ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেট ছিল ৬২৫ কোটি টাকা। এ বছর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৫০ কোটি টাকা কমে হয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, এই ৫৭৫ কোটি টাকার মধ্যে মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ব্যয়ই (বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পরিচালন খরচ) ৩১৬ কোটি টাকা; আর মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন ব্যয় (অবকাঠামো নির্মাণসহ সাংস্কৃতিক খাতের অন্যান্য খরচ) মাত্র ২৬০ কোটি টাকা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য এই ৫৭৫ কোটি টাকার বরাদ্দ মোট জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ০২ শতাংশ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে এই খাতে মোট জিডিপির অন্তত ০১ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি উত্থাপিত হচ্ছে।

 

দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংগঠক ও বিশ্লেষকরা বলেছেন, নগর-মহানগর এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চার বিকাশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্রিয়াশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য এই বাজেট বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। আগামী প্রজন্মকে ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন করে গড়ে তুলতে এবং শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চাকে বিকশিত করার লক্ষ্যে সরকারের অবশ্যই সাংস্কৃতিক খাতে আরও বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

 

কেবল অর্থনৈতিক উন্নতিতে যে দেশের সাংস্কৃতিক অগ্রগতি এবং মানবিক প্রগতি অর্জিত হবে না তা অনুধাবন করা জরুরি। এ প্রসঙ্গটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কথা দিয়ে শেষ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘দেশ মানুষের সৃষ্টি। দেশ মৃন্ময় নয়। সে চিন্ময়। মানুষ যদি প্রকাশমান হয় তবেই দেশ প্রকাশিত। সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা ভূমির কথা যতই উচ্চকণ্ঠে রটাব ততই জবাবদিহির দায় বাড়বে।  প্রশ্ন উঠবে

প্রাকৃতিক দান তো উপাদান মাত্র, তা নিয়ে মানবিক সম্পদ কতটা গড়ে তোলা হল।’ ভাবা প্রয়োজন যে প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিপুল শ্রমশক্তি দিয়ে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে আমরা ধাবিত হচ্ছি, সেখানে সংস্কৃতির সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কতটা মানবিক সম্পদ আমরা বিকশিত করতে পারছি।