‘বাংলাদেশ চিড়িয়াখানা আইন’-এর খসড়া চূড়ান্ত

হত্যা করে মুমূর্ষু প্রাণীর কষ্ট দূর করা হবে!

চিড়িয়াখানার মুমূর্ষু প্রাণীকে সেবা-শুশ্র ষা দিয়ে সারিয়ে তোলার পরিবর্তে হত্যা করা হবে। বয়সের ভারে কাবু জীবজন্তুর ‘শারীরিক অক্ষমতা দূর করার নামে’ তাদের জীবন কেড়ে নেওয়া যাবে। সংক্রমণযোগ্য রোগ হতে অন্যের জীবন রক্ষার্থেও প্রাণীর মৃত্যু ঘটানোর বিধান রাখা হয়েছে ‘বাংলাদেশ চিড়িয়াখানা আইন’ নামে একটি খসড়া আইনে। এই খসড়া আইন নিয়ে পরিবেশবাদীরা বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি মানবতাবিরোধী।   

খসড়া আইনে প্রাণী হত্যার জন্য রাখা হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। বলা হয়েছে, কোন পদ্ধতিতে হত্যা করা হন তা নির্ধারণে চিফ ভেটেরিনারি অফিসারসহ ভেটেরিনারিয়ান ও প্রাণী পুষ্টিবিদদের সমন্বয়ে ৫ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করতে হবে। ভেটেরিনারি সার্জনের উপস্থিতি ছাড়া কোনো প্রাণীর মৃত্যু ঘটানো যাবে না। এভাবে প্রাণী হত্যা করা হলে হত্যার কারণ ঘটনার সাত দিনের মধ্যে সরকারকে জানাতে হবে।  

প্রাণীকে যথাসম্ভব বিনা উৎপীড়নে, আরামদায়ক ও বেদনাবিহীন মৃত্যু ঘটানোর প্রক্রিয়া ‘ইউথেনসিয়া’র বিধানসহ খসড়া আইনটি মতামতের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রইছউল আলম ম-ল দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা করে শিগগিরই খসড়া আইনটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় তোলা হবে।

খসড়া আইনটি মানবিক কি না একদিকে সেই বিতর্ক যেমন উঠেছে অপরদিকে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলেও সমালোচনা চলছে পরিবেশবিদ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু নাসের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খসড়া আইনটি যে অমানবিক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের মতো অন্যান্য প্রাণীর প্রতি আমাদের মমত্ববোধ সর্বজনবিদিত। গবাদিপশু অসুস্থ হলে গৃহস্থ রাত জেগে শুশ্রƒষা করে। অসুস্থ প্রাণীকে সেবা দিয়ে সারিয়ে তুলতে হবে। চিড়িয়াখানা এতদিন যে নিয়মে চলেছে সেই নিয়মেই আগামী দিনগুলোতে চলতে পারবে না কেন?

 প্রাণী হত্যার বৈধতা কোনোভাবেই দেওয়া উচিত নয়। আর প্রাণী হত্যার বৈধতা দেওয়া হলে চিড়িয়াখানাগুলো উজাড় হয়ে যেতে পারে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘খসড়া আইনটি অনুমোদনের আগে আমাদের চারপাশে কী ঘটে তা আমলে নেওয়া উচিত। আমাদের দেশে দুর্নীতি হয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। একটা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে যখন দুর্নীতি হয় তখন সেই প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সংশ্লিষ্ট সবাই তার ভাগ পায়। চিড়িয়াখানায়ও সবাই মিলে দুর্নীতি করবে। একজন সাক্ষ্য দেবে পশু অসুস্থ। অন্যজন সাক্ষ্য দেবে অসুস্থ প্রাণীকে বাঁচানো যাবে না। এভাবে শেষ পর্যন্ত সুস্থ প্রাণী গায়েব হয়ে যাবে। হরিণের মতো যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া যায় সেসব প্রাণীর মাংস সংশ্লিষ্টদের বাসায় চলে যাবে। প্রস্তাবিত আইনটি  মানবতাবিরোধী। পৃথিবীর যেখানেই এ ধরনের আইন হয়েছে সেখানে শক্ত প্রতিবাদ হয়েছে।’

তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক আইনটির অপব্যবহারের সম্ভাবনার কথা নাকচ করে দিয়েছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘খসড়া আইনটিতে প্রাণীর মৃত্যু ঘটানোর বিষয়টি অমানবিক নয়, বরং সেটাই মানবিক। একটা মুমূর্ষু প্রাণী যদি বেঁচে থেকে কষ্ট পায় সেটাই অমানবিক। আমাদের উচিত তার কষ্ট লাঘবের পথ সৃষ্টি করা। তাছাড়া খসড়া আইনে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রাণীর মৃত্যু ঘটানোর কথা বলা হয়েছে।’

জাতীয় চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সপ্তাহে চিড়িয়াখানার একটি সিংহ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সিংহটিকে পরিচর্যা খাঁচায় নিয়ে এসেছি। আমরা সবাই বুঝতে পারছি সিংহটিকে বাঁচানো যাবে না। এই অবস্থায় সিংহটির মৃত্যুই শ্রেয়। কিন্তু আইনের অভাবে আমরা সেই সুযোগ পাচ্ছি না। চিড়িয়াখানা আইনটি পাস হলে সেই সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

খসড়া আইনে বেসরকারি চিড়িয়াখানার বিষয়ে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বেসরকারি চিড়িয়াখানা স্থাপনে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই আইন হওয়ার আগে বেসরকারি পর্যায়ে যেসব চিড়িয়াখানা গড়ে উঠেছে সেসব চিড়িয়াখানার জন্য এক বছরের মধ্যে লাইসেন্স নিতে হবে। লাইসেন্স না নিলে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। বলা হয়েছে, চিড়িয়াখানার সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য সরকার ১৮ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবে। এতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী প্রধান উপদেষ্টা হবেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ আইজিপি, র‌্যাব মহাপরিচালক, প্রধান বন সংরক্ষক ও প্রাণিবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা এ কমিটির সদস্য থাকবেন। এ কমিটি বছরে কমপক্ষে একবার সভা করবে।  

খসড়া আইন অনুযায়ী বেসরকারি কোনো চিড়িয়াখানাই সরকারের অনুমোদন ছাড়া দেশ বা বিদেশ থেকে বিদেশি প্রজাতির বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করতে পারবে না। মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া আন্তঃপ্রাণী প্রজনন করা যাবে না। অবৈধভাবে প্রাণী ট্রাফিকিং করা যাবে না। 

খসড়া আইনে প্রাণীর খাঁচা, আবাসন ও প্রদর্শনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। চিড়িয়াখানায় সংরক্ষিত প্রত্যেক প্রাণীর আরামদায়ক জীবনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, প্রাণীর প্রকৃতি বিবেচনা করে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ বা সুবিধাদি সৃষ্টি করে খাঁচায় আবদ্ধ করতে হবে। দর্শনার্থীরা প্রাণীকে উত্তেজিত করতে পারবে না। প্রাণী পীড়নের কারণ হয় এমন আচরণ না করার জন্য দর্শনার্থীদের সতর্ক করতে হবে। দলগতভাবে যেসব প্রাণী চলাচল করে সেসব প্রাণীকে স্বাস্থ্যগত কারণে ভেটেরিনারি সার্জনের পরামর্শ ছাড়া আলাদা রাখা যাবে না। প্রাণী থেকে প্রাণীতে বা মানুষে সংক্রমণযোগ্য রোগে আক্রান্ত কি না তা প্রতি বছর পরীক্ষা করতে হবে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক বেসরকারি চিড়িয়াখানায় নিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত বা চাহিবা মাত্র সেবা দেওয়ার জন্য খ-কালীন চুক্তিভিত্তিক ভেটেরিনারি সার্জন থাকতে হবে। সার্জনের সংখ্যা চিড়িয়াখানার আয়তন, প্রাণীর প্রকৃতি ও প্রজাতির ওপর নির্ভর করবে। ভেটেরিনারি সার্জনের পরামর্শ ছাড়া চেতনানাশক প্রয়োগ করা যাবে না।  চিড়িয়াখানায় একই প্রজাতির একই লিঙ্গের একটি প্রাণী রাখা যাবে না। কোনো চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাদের মজুদ প্রাণী লোকালয়ে ছেড়ে দিতে পারবে না। মৃত প্রাণীর মমি করে সংরক্ষণ করা যাবে। সরকারি চিড়িয়াখানার মতো বেসরকারি চিড়িয়াখানায় প্রবেশের জন্য ফি নির্ধারণ করা যাবে। তবে এই ফি সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে হবে।