দেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের সকালের নাশতা বদলের খবর গতকাল সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। এ খবর যথার্থই ঐতিহাসিক বটে। কেননা ১৭৮৮ সালে পুরান ঢাকায় দেশের প্রথম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থাপনের সময় থেকে সকালের নাশতা হিসেবে যে রুটি-গুড়ের প্রচলন হয়েছিল; ব্রিটিশ উপনিবেশ, পাকিস্তানি উপনিবেশ পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে তা পাল্টাতে সময় লাগল পাক্কা ২৩১ বছর। এতদিন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য সকালের নাশতায় বরাদ্দ ছিল ১১৬ দশমিক ৬৪ গ্রাম আটার রুটি ও ১৪ দশমিক ৫৮ গ্রাম আখের গুড় এবং হাজতিদের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮৭ দশমিক ৪৮ গ্রাম আটার রুটি ও একই পরিমাণ আখের গুড়। কিন্তু নতুন নিয়মে এখন থেকে সারা দেশের সব কয়েদি ও হাজতিকে সকালের নাশতায় সপ্তাহে দুই দিন সবজি-খিচুড়ি, একদিন হালুয়া-রুটি এবং বাকি চারদিন সবজি-রুটি খেতে দেওয়া হবে। রবিবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন নাশতা বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় থেকেই সারা দেশের সব কারাগারে তা অনুসৃত হচ্ছে। এই উদ্যোগ অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য।
সকালের নাশতা বদলের এই ইতিবাচক পদক্ষেপের সঙ্গে দেশে কারাবন্দিদের অন্যান্য অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়গুলোও পর্যালোচনার দাবি রাখে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনে কারা অভ্যন্তরের যে চিত্র জনসমক্ষে উঠে এসেছে তাতে বন্দিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আইনি সুরক্ষা এবং মানসিক সুরক্ষার প্রশ্নে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারাগারগুলোতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বা কয়েদি ও বিচারাধীন অবস্থায় আটক বা হাজতিদের থাকার ব্যবস্থা, খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, চিকিৎসা এবং অন্যান্য আইনি অধিকারের এক লম্বা তালিকা কারা আইনে লিপিবদ্ধ থাকলেও এর খুব যৎসামান্যই তারা ভোগ করে থাকেন বলে প্রতীয়মান হয়। ব্যাপক দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তবিক সংকট হিসেবে দেখা হয় দেশের কারাগারগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে প্রায় দুই-তিন গুণ বেশি কারাবন্দির সংখ্যাকে।
দেশের ৬৮টি কারাগারের সর্বমোট ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৩৭ হাজার জন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের এক পরিসংখ্যান অনুসারে সেখানে বন্দির সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৫ হাজার। এ প্রসঙ্গে বছর দুয়েক আগে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধি ও আটক বন্দির গড় সংখ্যা বিবেচনায় কারাগারগুলোর মোট ধারণ ক্ষমতা ৮০ হাজার হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। অতিরিক্ত চাপের কারণে কারা অভ্যন্তরে বন্দিরা যে মানবেতর পরিস্থিতিতে থাকতে বাধ্য হন এবং নানারকম অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়াসহ যে দুঃসহ মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সংকটের সমাধান কোন পথে হবে দেশে অপরাধ এবং অপরাধীর সংখ্যা কমানোর মধ্য দিয়ে নাকি কারাগারগুলোতে বন্দি ধারণ ক্ষমতা ও আরও কারাগার বানিয়ে?
বিদ্যমান কারা আইনটি হলো প্রিজন অ্যাক্ট-১৮৯৪। অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে কিছু সংশোধনী যোগ করা হলেও মূলত ১২৫ বছর আগের উপনিবেশিক আইন দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে কারাগারগুলো। উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শাসকরা শাসিত দেশের জনগণকে শাস্তি দিয়ে বশ্যতা আদায়ে বাধ্য করার জন্য যেসব বিধিবিধান প্রণয়ন করেছিলেন স্বাধীন দেশেও এ সংক্রান্ত আইনকানুন অনেকটা সেই পর্যায়েই রয়ে গেছে। গত বছর আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, শাস্তিবিধান নয় অপরাধীদের সংশোধন করার লক্ষ্য নিয়ে কারাগারগুলোকে সংশোধনাগারে পরিণত করতে চায় সরকার। অবশ্য, এজন্য বিদ্যমান ‘প্রিজন অ্যাক্ট-১৮৯৪’ পরিবর্তন করে ‘প্রিজন অ্যান্ড কারেকশনাল সেন্টার অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করার কাজ শুরু হলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
উপনিবেশিক আইন পাল্টে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন ধরনের কারাগার বা সংশোধনাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ খুবই উৎসাহব্যঞ্জক সন্দেহ নেই। কিন্তু কারাগারগুলোতে যখন বন্দিদের প্রাপ্য ন্যূনতম অধিকারগুলোও বাস্তবায়িত হয় না এবং কারগারগুলোর ব্যবস্থাপনায় সীমাহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তখন এসব দুরাশাই মনে হয়। বন্দিদের চিকিৎসার জন্য দেশের ৬৮টি কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১২৯টি হলেও বর্তমানে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৮ জন। প্রত্যেক জেলা কারাগারে একজন করে সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ও মনোবিজ্ঞানী এবং কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে এর পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানী থাকার কথা থাকলেও যেখানে চিকিৎসকই নেই সেখানে বাকিটা বোধগম্য। এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে কারাগারগুলোতে বন্দিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিমানসম্মত খাদ্য, পরিচ্ছন্ন থাকার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও আইনি অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শাস্তিমূলক নয় বরং সংশোধনমূলক কারা আইন করে কারা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।