১১ দিন পর ভাগ্নেকে ফেরত পেলেন সোহেল তাজ

চট্টগ্রাম থেকে ‘নিখোঁজের’ ১১ দিন পর সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজের ভাগ্নে ইফতেখার আলম সৌরভকে (২৮) ফিরে পেয়েছে তার পরিবার। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ময়মনসিংহের তারাকান্দার একটি চালকলের সামনে সৌরভকে একটি গাড়ি থেকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পরে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের একটি দল তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে গতকাল দুপুরে ঢাকার বনানীতে সোহেল তাজের বাসায় মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়। গাড়ি থেকে ফেলে রেখে যাওয়ার সময় সৌরভের হাত-পা ও চোখ বাঁধা ছিল বলে জানিয়েছেন সোহেল তাজ। তিনি জানান, উদ্ধার করার সময় সৌরভের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। গতকাল বেলা ১১টার দিকে ফেইসবুক লাইভে এসে এবং নিজের বাসায় উপস্থিত সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সোহেল তাজ।

তিনি বলেন, ‘সৌরভকে যখন পাওয়া যায় তখন তার হাত-পা বাঁধা ছিল। গায়ে জামা ছিল না, শুধু পায়জামা পরা ছিল। তার চোখ ছিল বাঁধা। খবর পেয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার তাকে বাসায় নিয়ে গোসলের ব্যবস্থা করেন এবং কিছু খাবার দেন। উদ্ধারের পর সৌরভ বুঝেই উঠতে পারেনি সে কোথায় এবং সেখানে কীভাবে গেছে।’

সোহেল তাজ আরও বলেন, ‘সে মানসিকভাবে একেবারে বিপর্যস্ত। আমরা এখন তাকে চাপমুক্ত রাখতে চাই। আমরা তাকে একটু স্বস্তিতে রাখতে চাই। সৌরভ আভাসে-ইঙ্গিতে কিছুটা জানিয়েছে, সে কী পরিস্থিতিতে ছিল। তবে এখন তার ওপর কোনো চাপ দেওয়া যাবে না।’

সৌরভ গত ১১ দিন কোথায় ও কীভাবে ছিলেন সে বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানাতে পারেনি। তবে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন শুধু বলেছেন, সৌরভকে কোথাও আটকে রাখা হয়েছিল।

গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে শাহ আবিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোরে সৌরভকে তারাকান্দার বটতলা বাজারের জামিল রাইস মিলের সামনে গাড়ি থেকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পরে তিনি নিজেই হেঁটে হেঁটে চালকলের ভেতরে যান। এরপর রাইস মিলের ম্যানেজার সমির তার ফোন থেকে সৌরভের পরিবারকে ফোন করেন। সৌরভও তখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ডিসি আমাকে বিষয়টি জানালে আমি ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে সেখানে ছুটে যাই। পরে তাকে উদ্ধার করে আমার কার্যালয়ে নিয়ে আসি।’

সৌরভ সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন জানিয়ে পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘তিনি আসলে কোনো কিছুই এ মুহূর্তে বলতে পারছেন না। তার বাহ্যিকভাবে কোনো সমস্যা আমরা দেখছি না। তাকে উদ্ধারের বিষয়টি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজকে জানানো হয়। পরে তার (সোহেল তাজ) কথার পরিপ্রেক্ষিতে সৌরভকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

সৌরভকে কারা ফেলে রেখে গিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তদন্তের বিষয়।’

গত ৯ জুন চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানা এলাকার আফমি প্লাজার সামনে থেকে নিখোঁজ হন সৌরভ। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের মামাতো বোনের ছেলে। পাঁচলাইশ এলাকায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাসকারী সৌরভ ঢাকার ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রামের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার অভিযোগ করে, ঢাকার এক ব্যবসায়ীর মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে তাকে অপহরণ করা হয়েছে।

সৌরভকে ‘অপহরণের’ পেছনে সরকারি কোনো বাহিনীর কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে এক ফেইসবুক পোস্টে সন্দেহ প্রকাশ করেন সোহেল তাজ। পরে গত সোমবার সৌরভের মা সৈয়দা ইয়াসমিন আরজুমান এবং বাবা সৈয়দ ইদ্রিস আলমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে সৌরভকে উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তিনি।

সৌরভের মা ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘গত ৮ জুন দুপুরে সৌরভের কাছে একটি ফোন আসে। তাকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সব কাগজপত্র তৈরি রাখতে বলা হয়। পরদিন বেলা ৩টায় আবার ফোন করে সৌরভকে চট্টগ্রাম মিমি সুপার মার্কেটের আগোরার সামনে থাকতে বলা হয়। সন্ধ্যা ৭টায় চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট দিতে আমার ছেলে আমাদের কাছ থেকে গিয়ে আর ফিরে আসে নাই। তার মোবাইল বন্ধ রয়েছে।’

ঢাকার ওই ব্যবসায়ীর মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে এর আগেও সৌরভকে কয়েকবার তুলে নিয়ে গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছিলেন তার মা-বাবা।

এরপর বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় ফেইসবুক লাইভে এসে সৌরভের উদ্ধার হওয়ার খবর জানান সোহেল তাজ। সেখানে তিনি বলেন, ‘ভোর ৫টা ২৭ মিনিটে সৌরভের মায়ের কাছে একটি ফোন আসে। ফোনে বলা হয়Ñ সৌরভকে একটি গাড়ি থেকে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

সোহেল তাজ জানান, তিনি এরপর চট্টগ্রামে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। উপকমিশনার ফোন করেন ময়মনসিংহের পুলিশ সুপারকে। পরে পুলিশ সুপার নিজে গিয়ে সৌরভকে পুলিশের হেফাজতে নেন।

বিপদের সময় সঙ্গে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সোহেল তাজ ফেইসবুক লাইভে আরও বলেন, ‘এরকম ঘটনা আর কারও ক্ষেত্রে ঘটবে না বলেই আমি আশা করছি।’