ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারে নিজের বাড়ি থেকে এক শীতের রাতে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান জনপ্রিয় রহস্য লেখিকা আগাথা ক্রিস্টি। লেখিকার এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সে সময় সারা বিশ্বেই আলোড়ন তুলেছিল। বলা হয়, তাকে খুঁজে পেতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল। পরাগ মাঝি লিখেছেন সেই অনুসন্ধানের গল্প
অন্তর্ধানের দিন
৩ ডিসেম্বর ১৯২৬, শুক্রবার। রাত সাড়ে ৯টা। নিজের আর্মচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন ক্রিস্টি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন দোতলায়। তার সাত বছরের মেয়ে রোজালিন্ড ঘুমোচ্ছে। মৃদু আলোয় তার মুখে ছড়িয়ে পড়েছে অনিন্দ্য সুন্দর এক আভা। ক্রিস্টি তার দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘুমন্ত রোজালিন্ডের নাকের নিচে আলতো করে চুমু খেলেন। তারপর আবার নিচের তলায় ফিরে এলেন। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল তার কালো রঙের মরিস কাউলি গাড়িটি। সেই গাড়িতে চড়ে বসলেন ক্রিস্টি। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল মরিস কাউলি। রাতের আঁধারে নিরুদ্দেশ হলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা লেখিকা আগাথা ক্রিস্টি।
তার এই নিরুদ্দেশ হওয়া পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, তার খোঁজে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ অনুসন্ধান কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল ইংল্যান্ডে। ওই অনুসন্ধানে এক হাজারেরও বেশি পুলিশ অফিসারকে নিয়োগ করা হয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরও কয়েক শ স্বেচ্ছাসেবী সাধারণ মানুষ। অনুসন্ধানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয় উড়োজাহাজও।
তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হিকস অনুসন্ধানকারী দলটিকে তাড়া দিচ্ছিলেন ক্রিস্টিকে খুঁজে বের করার জন্য। অনুসন্ধান কার্যক্রমটি এত বৃহৎ পরিসরে হচ্ছিল, তাতে অংশ নিয়েছিলেন বিখ্যাত গোয়েন্দা কাহিনী শার্লক হোমসের রচয়িতা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল এবং লর্ড পিটার উইমসি সিরিজের লেখিকা ডরোথি লেই সায়ার্স। তাদের বিশেষ জ্ঞান রহস্য লেখিকাকে খুঁজে বের করার জন্য ব্যবহার করছিলেন।
খুঁজে পাওয়া গেল গাড়িটি
আগাথা ক্রিস্টি নিখোঁজ হওয়ার পর তার গাড়িটি খুঁজে পেতে খুব বেশি সময় লাগেনি পুলিশের। ক্রিস্টির কালো রঙের মরিস কাউলি গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় দক্ষিণ ইংল্যান্ডের গিল্ডফোর্ডের কাছাকাছি একটি ঢালু এলাকায়। কিন্তু সেখানে আগাথা ক্রিস্টির কোনো চিহ্নমাত্র ছিল না। গাড়িটি একটি খাড়ির শেষ প্রান্তে পাওয়া গিয়েছিল। এর সামনের চাকাগুলো খাড়ির ওপর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। অল্পের জন্য এটি ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়নি। তবে, গাড়িটি দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছিল কি-নাÑ এমন কোনো নিদর্শনও খুঁজে পায়নি পুলিশ। ক্রিস্টি নিখোঁজ হওয়ার তৃতীয় দিন গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। গাড়ি উদ্ধার হলেও অনুসন্ধানকারীদের কাছে নিখোঁজ হওয়ার তৃতীয় দিনেও অধরা হয়ে রইলেন ক্রিস্টি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জল্পনা-কল্পনাও বাড়ছিল। গণমাধ্যমগুলো ক্রিস্টির নিখোঁজ হওয়া নিয়ে একের পর এক ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল। শুধু তাই নয়, এসব প্রতিবেদনের মধ্যে নানা ধরনের তথ্য ও মতামত প্রকাশিত হচ্ছিল।
এ যেন নিজেরই উপন্যাস
আগাথা ক্রিস্টির নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এতটাই রহস্যজনক ছিল, সবাই এই রহস্যে ডুব দিয়েছিল। ক্রিস্টির অনুসন্ধান অগ্রগতি জানতে পত্রিকাগুলোতে প্রতিদিন হুমড়ি খেয়ে পড়ত সাধারণ মানুষ। পুরো ঘটনাটিকে মনে হতে লাগল একটি রহস্য উপন্যাস। এ ধরনের রহস্যময় উপন্যাসই লিখতেন ক্রিস্টি। রহস্য উপন্যাসের একটি জনপ্রিয় টার্ম হলোÑ ‘হুডানিট’ বা ‘হো ডান ইট’। এই থিমের ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে ক্রিস্টির বেশ কয়েকটি রহস্য উপন্যাস। কোনো রহস্যপূর্ণ ঘটনায় নেপথ্যের ব্যক্তিকে খুঁজে বের করাই গল্পের চরিত্রগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য। ক্রিস্টির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া যেন তার কোনো উপন্যাসের বাস্তব গল্প। যেখানে তার গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, তার অদূরেই ছিল একটি প্রাকৃতিক ঝরনা। সাইলেন্ট পুল নামে এই ঝরনাটির ফলে সৃষ্ট জলাশয়ে কয়েক দিন আগে দুই কিশোর প্রাণ হারিয়েছিল। কিছু কিছু সাংবাদিক মত দিলেন, ওই ঝরনার জলেই হয়তো ডুবে মরেছেন ক্রিস্টি। তাদের ক্রিস্টি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন সশরীরে ক্রিস্টিকে পাওয়া যাচ্ছিল না এবং তার আত্মহত্যা করার মতটিও জোরালো হচ্ছিল না। কারণ, একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি ছিলেন যথেষ্ট সফল। নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগেই প্রকাশিত হয়েছে তার ষষ্ঠ উপন্যাস ‘দ্য মার্ডার অফ রজার অ্যাক্রোইড’। এই উপন্যাসটি সে সময় রমরমা ব্যবসা করছিল বাজারে। ইংল্যান্ডের ঘরে ঘরে আগাথা ক্রিস্টি একটি সুপরিচিত নাম।
হঠাৎ ক্রিস্টির চিঠি!
নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর ক্রিস্টির অনুসন্ধান কাজে হঠাৎ করেই ছন্দপতন হয়। ৮ ডিসেম্বর পুলিশ দাবি করে, ক্রিস্টি বেঁচে আছে। কারণ তার স্বামীর ছোট ভাই পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি ক্রিস্টির কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন। ওই চিঠিতে ক্রিস্টি তাকে জানিয়েছেন, ইয়র্কশায়ারে স্পা এবং চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তিনি গেছেন। অনুসন্ধান কার্যক্রমও স্থগিত করার ঘোষণা দেয় পুলিশ। কিন্তু আসলে অনুসন্ধান আগের মতোই চলতে থাকে। সম্ভাব্য স্থানে খোঁজ করা হয় ক্রিস্টির। এমনকি তার পোষা কুকুরকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, যেন মালকিনের গন্ধ শুকে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। কিন্তু ক্রিস্টি যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। শিগগিরই চিঠির ব্যাপারটিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে পুলিশ। ফলে গোয়েন্দারা তার আত্মহত্যার সম্ভাবনাকেই জোর দিচ্ছিলেন। তাই যেখানে ক্রিস্টির গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল, ওই এলাকার সাইল্যান্ট পুল নামের জলাশয়টিতে জোর অনুসন্ধান চালানো হয়। এই পুকুরটি তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখা হয়। ফলাফল শূন্য।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, যেখান থেকে ক্রিস্টি নিখোঁজ হন, সেখানে পুলিশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে পেয়েছে। মহিলাদের ব্যবহৃত একটি কোট পাওয়া যায়, যার মধ্যে বিষ এবং অপিয়াম পাওয়া গেছে। একটি সুগন্ধি এবং ফেস পাউডার রাখার একটি বক্সও পাওয়া যায়। কিন্তু এসব সূত্র ক্রিস্টির পরিবার থেকে নাকচ করে দেওয়া হয়। কারণ পুলিশ যে সুগন্ধিটি পেয়েছিল, ক্রিস্টি তা ব্যবহার করতেন না। আর কোটটিও ক্রিস্টির ছিল না।
নানা জনের নানা মত
ক্রিস্টিকে খুঁজে পেতে সব চেষ্টাই যখন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল, তখন অনেকেই বলছিলেন, এটি লেখিকার ইচ্ছাকৃত আত্মগোপন ছাড়া আর কিছু নয়। তারা এটিকে তার পাবলিক স্টান্টবাজি হিসেবে আখ্যায়িত করে। নতুন বইটি সম্পর্কে সবাইকে আগ্রহী করে তুলতেই তিনি এমন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি হয়তো চাইছেন, নতুন বইটির বিক্রি তার আগের সব বইগুলোকে ছাড়িয়ে যাক। তবে, এ ধরনের মতকে রাগান্বিতভাবেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন, ক্রিস্টির ব্যক্তিগত সহকারী। তিনি জানিয়েছিলেন, ক্রিস্টি মোটেও এ ধরনের মানসিকতা ধারণ করেন না। আর তিনি এরই মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তাই নতুন করে এ ধরনের স্টান্টবাজি তার প্রয়োজনও নেই।
অনেকেই বলছিলেন আরও ভয়ংকর সব অনুমানের কথা। কারও কারও মতে, ক্রিস্টিকে খুন করে ফেলেছেন তার স্বামী আর্চি ক্রিস্টি। প্রথম বিশ^যুদ্ধে তিনি একজন পাইলট হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন এবং ব্যক্তিজীবনে তার নারীঘটিত অনেক কেলেঙ্কারি আছে। তার একজন রক্ষিতা থাকার খবরটিও কানে কানে ছড়িয়ে যায়।
ক্রিস্টির অনুসন্ধান কার্যক্রমে নিযুক্ত রহস্য লেখক আর্থার কোনান ডয়েল ছিলেন জাদুবিদ্যায় বিশ^াসী। তাই ক্রিস্টির অনুসন্ধানে তিনি এই অস্বাভাবিক মাধ্যমেও চেষ্টা করেছিলেন। তিনি লেখিকার হাতের গ্লাভস সংগ্রহ করে একজন প্রথিতযশা পুরোহিতকে দিয়ে ক্রিস্টির অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি। আরেক রহস্য লেখিকা ডরোথি সায়ার্স যেখান থেকে ক্রিস্টি নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেই জায়গাটি পরিদর্শন করেন। তিনি আশা করেছিলেন, হয়তো কোনো ক্লু তিনি পেয়ে যাবেন। তার এই প্রচেষ্টাও ফলপ্রসূ হয়নি।
সারা বিশ্বে আলোড়ন
ঘটনা এমনভাবে মোড় নিতে শুরু করে, এটি ক্রমেই ইংল্যান্ড ছাড়িয়ে বহির্বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে। নিখোঁজ হওয়ার তৃতীয় দিনই (৬ ডিসেম্বর, ১৯২৬) মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় খবর ছাপা হয় ক্রিস্টিকে নিয়ে। এরপর ধারাবাহিকভাবেই অনুসন্ধান কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আপডেট প্রকাশিত হতে থাকে পত্রিকাটিতে। অন্যান্য দেশের গণমাধ্যমও সরব হয়ে ওঠে এই ইস্যুটিতে। ক্রিস্টি যখন নিখোঁজ হন, তখন তার বয়স ছিল ৩৬। নিখোঁজ হওয়ার আগে তার ছয়টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে তার বিখ্যাত ‘দ্য সিক্রেট অ্যাডভার্সারি’ এবং ‘দ্য মার্ডার অন দ্য লিংকস’ উপন্যাস দুটিও ছিল। নিখোঁজ হওয়ার সময় পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বাইরেও তার একটি পাঠকমহল এবং ভক্তকুল গড়ে উঠছিল। তাই তার নিখোঁজ রহস্যটি সারা বিশে^র লেখক এবং পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলে। তাই ক্রিস্টিকে খুঁজে বের করতে চাপের মধ্যে পড়ে যায় প্রশাসন।
সোয়ান হাইড্রো হোটেল!
অবশেষে অনুসন্ধান সফলতা পেল। আগাথা ক্রিস্টি নিখোঁজ হওয়ার ১১ দিন পর ১৪ ডিসেম্বর তার খোঁজ পাওয়া গেল। হ্যারোগেট শহরের বিখ্যাত একটি হোটেলে তার খোঁজ মিলল। সুস্থ এবং নিরাপদেই ছিলেন। তবে, তাকে খুঁজে পাওয়ার পর ঘটনা মোড় নিল অন্যদিকে। তার হঠাৎ নিরুদ্দেশ নিয়ে হাজারো প্রশ্ন ছিল অনুসন্ধানকারী তথা সাধারণ মানুষের। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি সম্পর্কে কোনো কিছুই মনে করতে পারছিলেন না ক্রিস্টি। কোনো কিছুই না। পুলিশ নানা উপায় অবলম্বন করেই সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়।
শেষে পুলিশ যে উপসংহার টানে, তার সারমর্ম হলো এই, সেই রাতে আগাথা ক্রিস্টি বাড়ি থেকে বের হলে তার গাড়িটি একটি ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হয়। তারপর সেখান থেকে তিনি লন্ডনের উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেখান থেকে হ্যারোগেটের উদ্দেশে একটি ট্রেনে চেপে বসেন। একপর্যায়ে স্পা টাউনে গিয়ে সোয়ান হাইড্রো নামে একটি হোটেলে ওঠেন। বর্তমানে এই হোটেলটি ওল্ড সোয়ান হাইড্রো নামে পরিচিত। হোটেলে যখন তিনি প্রবেশ করেন, তখন তার সঙ্গে কোনো লাগেজও ছিল না। হোটেলে নাম এন্ট্রি করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন থেরেসা নিল। ধারণা করা হয়, এই থেরাসা নিল ছিলেন তার স্বামীর রক্ষিতা।
গত শতাব্দীর ২০-এর দশকে, অর্থাৎ যে সময়টিতে ক্রিস্টি নিখোঁজ হয়েছিলেন, সে সময় উত্তর ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেট শহরটি ফ্যাশনেবল ও রুচিসম্মত তারুণ্যকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। ফুটবল ক্লাব, স্পা টাউনের মতো আরও অনেক প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছিল এই হ্যারোগেট। শহরটির সোয়ান হাইড্রো হোটেলে আগাথা যখন অবস্থান করছিলেন, তখন কারও মধ্যেই কোনো সন্দেহের উদ্রেক হয়নি। তিনি যথারীতি বল ড্যান্স পাম কোর্টে অংশ নিচ্ছিলেন। অন্যদের মতোই হই-হুল্লোড় আর আনন্দ-উল্লাসে মেতে ছিলেন। তবে, তাকে দেখে চিনতে পেরেছিল হোটেলের ব্যাঞ্জোবাদক বব তাপিন। তিনিই পুলিশকে তার ব্যাপারে অবহিত করেন। পরে পুলিশ ক্রিস্টির স্বামী কর্নেল ক্রিস্টিকে এই তথ্য জানায়। কর্নেল ক্রিস্টি আগাথা ক্রিস্টিকে উদ্ধারের জন্য সঙ্গে সঙ্গেই হ্যারোগেটের সোয়ান হাইড্রো হোটেলের উদ্দেশে রওনা করেন।
স্বামীর সঙ্গে ক্রিস্টির যখন দেখা হয়, তখন তিনি ছিলেন অনেকটাই ভাবলেশহীন। তার কোথাও যাওয়ার কোনো তাড়া ছিল না। সান্ধ্যকালীন পোশাক পরিবর্তনের জন্য স্বামীকে অনেকক্ষণ হোটেল লাউঞ্জে বসিয়ে রাখলেন। পরবর্তী জীবনে আগাথা ক্রিস্টি কখনোই তার জীবনের নিখোঁজ ১১ দিন নিয়ে কোনো কথা বলেননি। কয়েক বছর ধরেই তার হারিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গটি মানুষের আলোচনার খোরাক হয়েছে। ১৯২৬ সালের ৩ থেকে ১৪ ডিসেম্বর কী ঘটেছিল ক্রিস্টির জীবনে, তা জানতে তার পাঠক এবং ভক্ত অনুরাগীরা উদ্গ্রীব ছিলেন।
তার স্বামী কর্নেল ক্রিস্টি দাবি করেছিলেন, গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্রিস্টি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ক্রিস্টির জীবনী লেখক অ্যান্ড্রু নরম্যানের তথ্য অনুযায়ী, উপন্যাস লেখিকা তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার সময়টিতে সম্ভবত মানসিক কোনো ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলেন। বড় ধরনের কোনো মানসিক আঘাত এবং বিষণœতার জন্য এমন ঘোর মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে। নরম্যানের মতে, মানসিকভাবে ক্রিস্টি সে সময় অন্য আরেকটি ব্যক্তিত্বে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। সেই ব্যক্তিত্বের নাম থেরেসা নিল। তাই পত্রিকায় নিজের হারিয়ে যাওয়ার খবর পড়ে তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর ঘটেনি। নিঃসন্দেহে লেখিকা তখন স্মৃতিবিলোপের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
নরম্যান এও দাবি করেন, আগাথা ক্রিস্টি সে সময়টিতে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠেছিলেন। তার মনের অবস্থা সে সময় খুব নাজুক অবস্থায় ছিল। পরবর্তী জীবনে লেখিকা তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘আনফিনিশড পোর্ট্রটে’-এ সেলিয়া চরিত্রটির মাধ্যমে নিখোঁজ সময়ে তার মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
হ্যারোগেট থেকে উদ্ধারের পর শিগগিরই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন ক্রিস্টি। তিনি আবার তার কলম হাতে তুলে নেন। লিখতে থাকেন একের পর এক রহস্য উপন্যাস। কিন্তু তিনি তার বহুগামী স্বামীকে বেশি দিন সহ্য করেননি। নিখোঁজ ঘটনার বছর দেড়েক পর ১৯২৮ সালের ১৭ মার্চ তিনি তার স্বামীকে ডিভোর্স দেন এবং এর দুই বছর পর ১৯৩০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি বিয়ে করেন প্রথিতযশা প্রতœতত্ত্ববিদ স্যার ম্যাক্স ম্যালোয়ানকে।
আমরা হয়তো আর কখনোই জানতে পারব না ঠিক কী ঘটেছিল ক্রিস্টির নিখোঁজ ১১ দিনে। এই রহস্য ক্রিস্টি গোপনেই রেখে গেলেন চিরতরে, যা হয়তো তার উপন্যাসের সুপরিচিত গোয়েন্দা অফিসার হারকুল পইরটও কোনো দিন সমাধান করতে পারেন না।