হঠাৎ, ইংল্যান্ড আর অপ্রতিরোধ্য নয়। হঠাৎ, ভারতীয়দেরও আটকে দেওয়া গেল স্পিনে। হঠাৎ, বিশ্বকাপ হয়ে উঠল আবার আন্দাজ-অসম্ভব!
পরপর দু-দিনের দুটি ম্যাচ। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে লিডসে ২৩২ পেরতে পারল না ইংল্যান্ড। বহু দিন পর এবার সত্যিই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ডকে। দুর্দান্ত ব্যাটিং, দুর্দান্ত বোলিং। টানা তিনশো পেরিয়ে যাওয়া অনায়াসে, বারবার। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ৩৯৭, অধিনায়ক মরগান সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডও করে ফেলেছিলেন এক ইনিংসে। রান পাচ্ছেন সবাই। জোফ্রা আর্চার তিন উইকেট করে তুলে নিচ্ছেন, প্রায় রোজ। নিজেদের দেশের মাঠে খেলা। পরিস্থিতি এবং পরিবেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি। এবং, তাদের কোনো ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তেও যায়নি!
শ্রীলঙ্কা, আরও পরিষ্কার করে বললে লাসিথ মালিঙ্গা, পাল্টে দিলেন সব। চার উইকেট ৪৩ রানে। ইংল্যান্ডের সেরা ব্যাটিং লাইনআপ ভঙ্গুর। শেষে একা বেন স্টোকস চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হার, দ্বিতীয়বার কোনো এশীয় দেশের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের পর শ্রীলঙ্কা। কাজটা এখন মোটেই সহজ নয়। সূচি বলছে, শেষ তিন ম্যাচ আয়োজকদের খেলতে হবে অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। যে তিন দেশই আছে সেমিফাইনালের লড়াইয়ে। খাতা-কলমের হিসাবে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে কঠিন তিন ম্যাচ। রাখা হয়েছিল সবার শেষে। আশা ছিল, প্রথম ছয় ম্যাচ জিতে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলবে তিনবারের ফাইনালিস্ট দেশ। শেষ তিন ম্যাচ নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হবে না আর। কিন্তু, ক্রিকেট, আবারও বুঝিয়ে দিল, যা ভাবা যায়, বেশিরভাগ সময়ই হয় না। আর, এখন যা অবস্থা, শেষ তিন ম্যাচে অন্তত দুটি ম্যাচ না জিতলে, এমন হতেই পারে যে, সেমিফাইনালে পৌঁছানই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে ইংল্যান্ডের।
সাউদাম্পটনের এজিয়েস বোলে আবার প্রতিযোগিতার সবচেয়ে দুর্বল দলের বিরুদ্ধে ভারতের তথাকথিত বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইন আপ টস জিতে ৫০ ওভার ব্যাট করে রান তুলল মাত্র ২২৪! অধিনায়ক বিরাট কোহলি যথারীতি আবারও একটি পঞ্চাশ করলেন, টানা তৃতীয় ম্যাচে। তার স্ট্রাইক রেটও একশোর বেশি, মানে যত বল খেললেন, রান তার চেয়ে বেশিÑ ৬৩ বলে ৬৭। বাকিরা কেউ আফগানিস্তানের স্পিনারদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছন্দ নন। ইনিংসে ৩৪ ওভার করলেন আফগান স্পিনাররা। ইংল্যান্ডের মাঠে, খেলা যেখানে শুরু হচ্ছে সকাল সাড়ে ১০টায়, সেখানে ৫০-এর মধ্যে যদি ৩৪ ওভার স্পিনাররা করেন, বোঝাই যাচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা ভালো পড়তে পেরেছিল আফগানিস্তান শিবির। অথচ, আগের ম্যাচেই আয়োজকদের বিরুদ্ধে খেলার দিন রশিদ খান দশ ওভার বোলিং করে ‘সেঞ্চুরি’ পেরিয়েছিলেন রান দেওয়ায়! শিবিরে পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই শেকড়ে, বারবার মনে পড়ছিল ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতীয় শিবিরের অবস্থা!
গ্রেগ চ্যাপেলের আমলের সেই ছন্নছাড়া বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসহীন ছিল ভারতীয় শিবির। গুরু গ্রেগ হঠাৎ ঝুঁকে পড়েছিলেন রাহুল দ্রাবিড়ের দিকে, দূরত্ব বেড়েছিল শচীন তেন্ডুলকার-সৌরভ গাঙ্গুলিদের সঙ্গে। সেই বারই বাংলাদেশের কাছে হার বিশ্বকাপে প্রথম। শিবিরে স্বাভাবিক ছন্দটাই হারিয়ে গিয়েছিল। অবিকল একই অবস্থা দেখা যাচ্ছিল আফগানিস্তান শিবিরে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বলেই আফগানিস্তানকে চেনে বিশ্ব। তাদের ক্রিকেট দলেও এত দল-উপদল, এত দলাদলি, কে জানত! কোট আবার ক্যারিবীয় ফিল সিমন্স, যার কাঁধে এমন বিভাজনের দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছিল সে-দেশের প্রচারমাধ্যম।
জার্সিতে ভারতীয় সংস্থা ‘আমূল’-এর লোগো নিয়ে ম্যাচে কিন্তু আমূল বদলে গেলেন সেই আফগানরাই। দুর্দান্ত স্পিরিট দেখা গেল ফিল্ডিংয়ে। রশিদ খান পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচেও ফিরে পেলেন ছন্দ। রোহিত শর্মাকে শুরুতে হারিয়ে সেই যে ছন্দহীন ভারত, বিরাট কোহলি থাকাকালীন যা ততটা বোঝা না গেলেও, কোহলির আউটের পর থেকে প্রকট। না হলে, ৫২ বল খেলে মাত্র ২৮ করেন মহেন্দ্র সিং ধোনি? বিজয় শঙ্কর, কেদার যাদবরাও উইকেটের সঙ্গে এবং স্পিনারদের বলের গতির হেরফেরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ।
শুক্র ও শনিবারের দুটি ম্যাচ তাই খুব পরিষ্কার বার্তা দিয়ে গেল বাকি দেশগুলোকে, বিশেষত বাংলাদেশকে। তিনটি ম্যাচ বাকি বাংলাদেশের। লক্ষ্য অবশ্যই থাকবে তিনটি জয়। কিন্তু, দুটি জয় নিশ্চিত করতে পারলেও সেমিফাইনাল কিন্তু এখন আর হাতের বাইরে নয় বলেই মনে হচ্ছে। বৃষ্টি মোটামুটি থেমে গিয়েছে, জুনের তৃতীয় সপ্তাহের পর আর ম্যাচ জলে যাবে না, এমন বলেছিল আবহাওয়া দপ্তর। শুধু বাংলাদেশই বা কেন, শ্রীলঙ্কাও পেয়ে গেল নতুন আশার আলো। বৃষ্টিতে ভেস্তে যাওয়া তাদের দুটি ম্যাচ থেকে পাওয়া দুটি পয়েন্ট এখন বিরাট গুরুত্বপূর্ণ, পয়েন্ট তালিকায় ছয় ম্যাচে ছয় নিয়ে পঞ্চম স্থানে থাকা শ্রীলঙ্কার।
ভারত-আফগানিস্তান ম্যাচের ফল যা-ই হোক না কেন, বিশ্বকাপে এসে পৌঁছল বিশ্বাস, অঘটন সম্ভব যে কোনো দিন। চমক পেতে তৈরি থাকুন!