জাতীয় ও রংপুর চিড়িয়াখানা আধুনিকায়ন প্রকল্প

দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত প্রকৌশলী পরামর্শক!

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে বেশুমার দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত প্রকৌশলী মো. আলী আকবরকে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ঢাকা ও রংপুর চিড়িয়াখানা আধুনিকায়ন প্রকল্পে। তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ছিলেন। বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে আলী আকবরের বিরুদ্ধে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে আটটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক); সব মামলাতেই তিনি জামিনে আছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার তথ্য গোপন করে জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ড. এস এম নজরুল ইসলাম তাকে নিয়োগ দিয়েছেন। ফলে আধুনিক চিড়িয়াখানা হিসেবে জাতীয় চিড়িয়াখানাকে গড়ে তোলার কাজ শুরুতেই হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ড. এস এম নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরামর্শক পদে যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রকল্পের কাজটি মাস্টাররোলের মতো। মাসে মাত্র ৫০ হাজার টাকা সম্মানীতে প্রকৌশলী আলী আকবরকে প্রকল্পে জুনিয়র পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পে যেসব কাজ হবে, তিনি সেগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন।’

দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত কর্মকর্তাকে কেন নিয়োগ দেওয়া হয়েছেÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক ইওআই প্রকাশ করেছি। প্রথমবারে কেউ আবেদন করেনি। দ্বিতীয়বারে কয়েকজন আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে আলী আকবর সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী (ফিটেস্ট) ছিলেন। তা ছাড়া তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকেরও পরামর্শক ছিলেন। তাই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিতর্কিত সাবেক কর্মকর্তা আলী আকবরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে আটটি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্রও (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির মামলায় চার্জশিট জমা হওয়ার পর ২০১১ সালে আলী আকবরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।  পরে তার বরখাস্তের আদেশ আর প্রত্যহার হয়নি। এ অবস্থাতেই তিনি অবসরে যান। দুদকের আট মামলাতেই তিনি জামিনে আছেন। ঢাকা ও রংপুর চিড়িয়াখানা আধুনিকায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেরামতের জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে আলী আকবর নিয়োগ পেয়েছেন গত মে মাসে। এরই মধ্যে তিনি কাজে যোগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে আলী আকবরের মোবাইল ফোনে কল করলে প্রথমবার বিষয়টি শোনার পরই তিনি সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকৌশলী আলী আকবরের নিয়োগের বিষয়টি জানি। কিন্তু তিনি দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন কি না, জানা নেই।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও জাতীয় চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৬০ সালে ১৮৬ একর জমিতে জাতীয় চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অসাধু চক্রের অপতৎপরতায় এটিকে বিশ্বমানের চিড়িয়াখানা হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়নি চিড়িয়াখানার ১৮৬ একর জমিও; এর অনেকটাই বেদখলও হয়ে গেছে। তা ছাড়া উন্নয়নের অভাবে রংপুর চিড়িয়াখানাও হয়ে পড়েছে শ্রীহীন। চিড়িয়াখানা দুটিকে বিশ্বমানের হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেরামতের জন্য সরকারি অর্থায়নে ২০১৭ সালে ৩৪ কোটি ২ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। এরই মধ্যে গত অর্থবছর পর্যন্ত ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের আওতায় জাতীয় চিড়িয়াখানার অবকাঠামো পরিবর্তন করে দর্শনার্থীদের জন্য একমুখী রাস্তা তৈরি করা হবে। এ ছাড়া প্রধান ফটক ও অন্যান্য ছোট ফটক; সুরক্ষা দেয়াল; দিকনির্দেশক; সব শ্রেণির দর্শনার্থীদের সহজে যাতায়াতের জন্য সিঁড়ি ও বসার ব্যবস্থা (ফুটপাত ও পার্কে ছাউনি এবং ছাউনি ছাড়া); রেলিং, সড়কদ্বীপ, রোড ডিভাইডার ও বিভিন্ন গাছের পাত্র, রাস্তা এবং বাগানে আলোর ব্যবস্থা; ফুটওভারব্রিজ, আন্ডারপাস, দেয়াল তৈরি ও বনায়নের (ভূ-প্রাকৃতিক) কাজও রয়েছে। পাশাপাশি চিড়িয়াখানার পশুপাখির খাঁচা পুরোপুরি বন্য আবহে তৈরি করতে জাপানি জু-আর্কিটেকচার ও জু-কনসালট্যান্টের সহায়তা নেওয়ার কথা রয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতির প্রাণী খাঁচাকে বদলে আধা প্রাকৃতিক, প্রাণিবান্ধব ও তিনস্তরের নিরাপত্তা বলয়বিশিষ্ট খাঁচা তৈরির প্রস্তাব রয়েছে প্রকল্পে। প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব আবাসস্থলের মতো পরিবেশ তৈরি করতে খাঁচার ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে স্বনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা।

তারা জানান, প্রকল্পে আরও রয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য খাঁচার নিরাপত্তায় স্টিলগ্রিলের সঙ্গে বিশেষায়িত কাচের আবরণ ও লোহার জাল ব্যবহার; বিশেষ কাচের দেয়াল থাকলে দর্শনার্থীরা খুব কাছ থেকে প্রাণীদের দেখতে পারবেন। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চিড়িয়াখানায় বসানো হবে দুষ্প্র্রাপ্য প্রাণীদের ১০টি ম্যুরাল। চিড়িয়াখানার কিউরেটরের দপ্তর, একটি প্রধান এবং চারটি নিরাপত্তা অফিস, প্রাণী হাসপাতাল ছাড়াও কর্মকর্তাদের জন্য নতুন একটি অফিসার্স কোয়ার্টারও তৈরি করা হবে এই প্রকল্পের আওতায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের কাজের জন্য দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের সমন্বয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যানও করা হচ্ছে। এই মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দলকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। পরে বুয়েটের দল বিদেশি পরামর্শকদের সঙ্গে নিয়ে কাজটি করবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত কর্মকর্তাকে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এই প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের বিষয়ে জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর বলেন, ঢাকার জাতীয় ও রংপুরের চিড়িয়াখানা উন্নয়নে একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা কমিশন থেকে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুতের জন্য বলা হয়েছে। ওই মাস্টারপ্ল্যানে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে প্রকৌশলী আলী আকবরকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রংপুর অঞ্চলের মানুষ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে রংপুর চিড়িয়াখানায় একই পশুপাখি দেখে আসছে। এর কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এ চিড়িয়াখানাটি আধুনিকায়ন করা ওই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।