দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশ মনে করে বাজেট ঘোষণায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে। ৫ শতাংশের ১ শতাংশ মনে করে জনজীবনে বাজেটের তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। আর ১৭ শতাংশ জানেই না বাজেট কী।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ব্র্যাক, উন্নয়ন সমন্বয় ও আই-সোশ্যাল পরিচালিত এক জরিপের প্রাথমিক ফলাফল থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে। দেশের দরিদ্র ও অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাজেট কী ধরনের প্রভাব ফেলে এবং এতে কী ধরনের ন্যূনতম পরিবর্তন আনা হলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবেÑ সে লক্ষ্যে একটি প্রকল্পের অধীনে জরিপটি পরিচালনা করছে সংস্থা তিনটি। প্রাথমিকভাবে ৪ হাজার ৮০০ খানায় এ জরিপ চালানো হয়েছে। এই গবেষণা ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলবে।
গতকাল মঙ্গলবার সিরডাপ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন উন্নয়ন সমন্বয়ের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, আই-সোশ্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনন্য রায়হান ও ব্র্যাকের পরিচালক কে এ এম মোরশেদ।
বক্তারা বলেন, এখনো দেশের এক-চতুর্থাংশ মানুষ দরিদ্র। এই চার কোটি প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনীতির যথাযথ সংযোগ হচ্ছে না। এই মানুষগুলোর সিংহভাগ জানে না সরকার তাদের জন্য কী করছে, কীভাবে তারা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সুবিধা নেবে। এজন্য সরকারকেই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে দরিদ্ররা কীভাবে তাদের অবস্থার উন্নতি করতে পারবে তা উঠে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান জানান, বর্তমানে ওপরের দিকে অতি উচ্চ শ্রেণি বাড়ছে। ফলে বাড়ছে আয় বৈষম্য। তবে ভোগের বৈষম্য তত খারাপ নয়, খেয়ে-পরে মানুষ বেঁচে আছে। মঙ্গাপীড়িতদের কথা এখন শোনা যায় না। তবে আয় বৈষম্য কমাতে হবে। এজন্য দরিদ্র ও অতি দরিদ্রদের স্বল্পমূল্যে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ আলাপ আমাদের বাজেটে খুব বেশি আসেনি। সবার জন্য নয়, গরিবদের জন্য এ ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শুরু করা হলে সামাজিক সুরক্ষা আরও এগিয়ে যাবে। অর্গানাইজড লেবার যেমন গার্মেন্ট কর্মীদের সার্বজনীন পেনশন স্কিমে নিয়ে আসা উচিত, মানবিক কারণে হলেও তা করা উচিত। অবশ্য এর জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও
থাকতে হবে। দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে কৃষি খাতের উন্নয়নের ভূমিকা বেশি। দেশে কোনো না কোনো ভাবে ৫০ শতাংশের বেশি লোক কৃষিতে জড়িত। এজন্য কৃষিতে গুরুত্ব অব্যাহত রাখতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ বক্তব্য রাখেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, বাজেটে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অনেক উদ্যোগ থাকছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে থাকছে তা দরিদ্ররা জানে না। এটা তাদের জানা দরকার। পাশাপাশি তাদের কী প্রয়োজন তাও তাদের থেকে আলোচনা করে জেনে নেওয়া দরকার।
জরিপের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ব্র্যাকের পরিচালক কে এ এম মোরশেদ। তিনি বলেন, জাতীয় নীতি ও কৌশল নির্ধারণে তৃণমূলের সম্পৃক্ততার আবশ্যকতা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় বাজেটের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানে প্রভাবিত করে তা নির্ধারণ করা। বাজেট বাস্তবায়ন পরিবর্তন করে কীভাবে সেসব প্রভাবকে জনবান্ধব করা যায় সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সাহায্য করা।
জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন আই-সোশ্যালের নির্বাহী কর্মকর্তা ড. অনন্য রায়হান। তিনি জানান, অধিকাংশই মনে করে বাজেট মানেই পণ্যমূল্য বৃদ্ধি। বাজেট নিয়ে দরিদ্রদের কোনো ব্যক্তিগত ভাবনা নেই। তবে দরিদ্ররা চায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ভর্তুকি, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার বেশি ব্যয় করুক। সরকার সামাজিক নিরাপত্তায় অনেক ব্যয় করলেও দরিদ্রদের এ বিষয়ে ধারণা অস্পষ্ট।