রপ্তানির সময় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য কার্টন খুলে সরিয়ে নিচ্ছে চোররা। পণ্যগুলো পোশাক কারখানা থেকে রপ্তানির উদ্দেশে বন্দরে পাঠানোর সময় ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, গাড়ির ড্রাইভার ও শ্রমিকদের যোগসাজশে চুরি হয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতিতে প্যাকেট খুলে কিছু পণ্য সরিয়ে ফেলে আগের মতো প্যাকেট করে রাখছে তারা। পরে সেগুলো সুযোগমতো বিক্রিও করছে চোরচক্র। এর ফলে পণ্য কম পেয়ে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন বিদেশি ক্রেতারা। বহির্বিশ্বে ক্ষুণœ হচ্ছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।
রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও চোরাই পণ্য ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রেতাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি মেসার্স লেনি অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য কাভার্ড ভ্যানসহ চুরি করে একটি চক্র। সেই অভিযোগসহ আরও কয়েকটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অনুসন্ধানে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (ডিবি) সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের রোবারি প্রিভেনশন টিম।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছে, সারা দেশে ৫০ থেকে ৬০টি চোরচক্র রপ্তানি পণ্য চুরির ক্ষেত্রে সক্রিয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থানায় মামলা না করে চুরির সঙ্গে জড়িত শ্রমিক নেতাদের ধরে খোয়া যাওয়া মালামালের অর্ধেক বা তিন ভাগের এক ভাগ দামে ফিরিয়ে নিচ্ছেন মালিকরা।
ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের রোবারি প্রিভেনশন টিমের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. সোলাইমান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, চোররা বিশেষ কৌশলে কার্টন থেকে পণ্য সরিয়ে ফেলে। একটি কার্টনে ১২টি পণ্য থাকলে তার ৪-৫টি
সরিয়ে ফেলে এবং আগের মতোই কার্টন প্যাকেট করে পোর্টে পাঠায়। পোর্ট কর্তৃপক্ষকেও ম্যানেজ করে চক্রটি। পণ্যগুলো ঠিক আছে এমন ছাড়পত্র নিয়ে শিপমেন্ট হয়ে চলে যায় বিভিন্ন দেশে। বিদেশি ক্রেতারা বুঝে পাওয়ার পরে যখন প্যাকেট খুলে দেখে পণ্য কম, তখন ক্ষতিপূরণ দিতে হয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে। তবে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
তিনি বলেন, চোরাই পণ্য কেনার জন্য দেশি-বিদেশি ক্রেতা রয়েছে। চক্রটি এই চোরাই পণ্যের ছবি হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক একাধিক ক্রেতার কাছে পাঠায়। বেশি দাম দেওয়া ক্রেতাকে পিকআপ ভ্যানে করে পণ্য পৌঁছে দেয়। এক দিনের মধ্যেই চোরাই পণ্যগুলো বিক্রি হয়ে যায়।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চুরি যাওয়া পণ্য ফিরে পাওয়ার আশায় থানায় মামলা না করায় এবং স্বল্প সময়ে চোরাই চক্র পণ্য বিক্রি করে বুঝিয়ে দেওয়ার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে চোররা দিনের পর দিন এ কাজ করে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
সোলাইমান মিয়া জানান, সিলেটি সাঈদ, মনাইয়া ও সুরুজ নামের তিন শ্রমিক এই চোরাই মালামাল টাকার বিনিময়ে মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া চক্রের অন্যতম হোতা।
ডিবি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি চুরির ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। তবে ঘটনা আরও বেশি ঘটেছে বলে ধারণা তাদের।
চুরির ঘটনার বেশির ভাগ মামলা হয়েছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা মডেল থানা, বন্দর থানা ও পাহাড়তলী থানায়। এসব মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, এসএস পরিবহন, গুড উইল ট্রান্সপোর্ট, সোনারতরী এক্সপ্রেস, দি ন্যাশনাল কেরিয়ার, বিসমিল্লাহ পরিবহন সংস্থা, তরঙ্গ ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, মেসার্স সুলতানী পরিবহন, জনি ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেডিং, মেসার্স আল্লাহরদান ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স ফাইমা ট্রান্সপোর্ট ও আরিফা পরিবহন সংস্থার কাভার্ড ভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য চুরি হয়েছে।
চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল এসএস পরিবহনের ৮ হাজার ২৫৮ পিস পোশাক সাভারের ধামরাই শফি মোটরস ডিপো থেকে চুরি হয়। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানায় মামলা হয়। ১৯ মার্চ কোনাবাড়ির মৌচাক থেকে গুড উইল ট্রান্সপোর্টের একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে ৭ হাজার ৩৫০ পিস জ্যাকেট চুরি হয়। এ ঘটনায় মামলা হয় পতেঙ্গা থানায়। ১৪ জানুয়ারি গাজীপুর থেকে এসিএল আসার পথে দি সোনারতরী এক্সপ্রেসের একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে ২ হাজার ৯৩৭ পিস পোশাক চুরি হয়। এমন আরও বেশ কিছু চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে বিভিন্ন থানায়।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য বিদেশে পাঠানোর সময় একটি চক্র সেখান থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে বহির্বিশ্বে দেশের ইমেজ ক্ষুণœ হচ্ছে। বায়ারদেরও ডেমারেজ দিতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, আমার জানা মতে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, ফেনী, সিদ্ধিরগঞ্জে, সোনারগাঁয়ের মদনপুরে একাধিক চক্র রয়েছে। এরা কাভার্ড ভ্যান তাদের নিজস্ব গোডাউনে নিয়ে কার্টন থেকে পণ্য বের করে সেখানে অন্য কিছু ঢুকিয়ে ফের প্যাকেট করে দেয়। এসব ঘটনায় মামলা করেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
পতেঙ্গা মডেল থানা ও বন্দর থানা পুলিশের দাবি, বেশির ভাগ পণ্য চুরি হয় গাজীপুর থেকে বন্দরে আসার পথে। থানায় অভিযোগ করলে চোরাই পণ্য উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়।
পতেঙ্গা মডেল থানার ওসি উৎপল বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাভার্ড ভ্যান থেকে মালামাল বদল করা, কাভার্ড ভ্যানসহ চুরি হওয়ার ঘটনায় মাঝেমধ্যেই অভিযোগ আসে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব মালামাল উদ্ধার করি। তবে এই চোরাই চক্রটি সংঘবদ্ধ। সাধারণত ঢাকা থেকে বন্দরে আসার আগেই ঘটনাগুলো ঘটে।’
ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান থানায় মামলা না করে চোরাই চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চুরি হওয়া পণ্য স্বল্প দামে ফের কিনে নেন। রপ্তানিকারকরাই মামলা করেন কম।