রথের মেলায়

প্রতি বছর আষাঢ় মাস এলেই সহকর্মী ডেনির কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পাই সিলেটে মণিপুরি সম্প্রদায়ের রথযাত্রা উৎসবে যাওয়ার। প্রায় একশ চুরানব্বই বছর ধরে চলে আসছে এই রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসব পালন করেন। এর এক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হয় উল্টোরথ। ভক্তদের বিশ্বাস, রথোপরি আসীন দেবমূর্তি দর্শন ও রথ টেনে নেওয়ার সুযোগ তাদের জন্য দেবতার আশীর্বাদ লাভের সহায়ক। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সময় করে উঠতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আমি আর মা রওনা দিলাম সিলেটের উদ্দেশে। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা, তখন সিলেটে পৌঁছাল আমাদের ট্রেন। সোজা চলে গেলাম সিলেটের বিখ্যাত পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টে। সেখানে সকালের নাশতা করলাম। এরপর ঠিক করলাম হোটেলে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বের হব রথযাত্রা দেখতে।  বের হবো, তখনই শুরু হলো মুষলধারায় বৃষ্টি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর কমে এলো বৃষ্টি। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। রিকশায় এগিয়ে চললাম সিলেট রিকাবীবাজারের দিকে। জিন্দাবাজার পেড়িয়ে চৌহাট্টায় পৌঁছার পর জ্যাম দেখতে পেলাম। রিকশাচালক বললেন, ওই দেখেন রথ যাচ্ছে। দূর থেকে দেখা পেলাম রথের। শত শত পুণ্যার্থী রথ টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা দূর থেকে প্রণাম করলাম। বলে রাখা ভালো, ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা অনঙ্গভীমদেব তিনরথের রথযাত্রা প্রচলন করেন। রিকশাচালক বললেন, আজ রাস্তায় জ্যাম থাকবে, মেলা বসেছে, আপনারা হেঁটে গেলে অনেক আগেই পৌঁছাতে পারবেন। দেরি না করে হেঁটে রওনা দিলাম। আমাদের মতো অনেক মানুষ হেঁটে এগিয়ে চলছেন। গন্তব্য রথের মেলার দিকে। কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলাম রাস্তার দুই পাশে মেলা বসেছে। এদিকে মোবাইল ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ডেনি বলে উঠল, স্যার চলে এসেছেন, আরেকটু পরেই মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে, সামনে এগিয়ে যাওয়া দুষ্কর, এত ভিড়। আমরা দ্রুত হেঁটে মূল অনুষ্ঠান স্থলে পৌঁছালাম। ডেনি আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। আমাদের নিয়ে গেল অনুষ্ঠান স্থলে। মাঠের ভেতর অনেক রথ। রথগুলো কাঠের তৈরি, মাটির থেকে উচ্চতা প্রায় বিশ-পঁচিশ ফিটের মতো। প্রতিটি রথ খুব সুন্দর করে সাজানো। রথের চাকাগুলোও কোনোটি কাঠের, কোনোটি সিমেন্টের। চারপাশে ধূপকাঠির মোহনীয় গন্ধ, শঙ্খ ধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাক বেজেই চলছে। সিলেট শহরে বারোটি মণিপুরি পাড়া আছে। প্রতিটি পাড়ায় থেকে নির্ধারিত দিনে সাজানো রথ টেনে নিয়ে আসা হয় রিকাবীবাজারের এই স্থানে। তারপর একসঙ্গে আরতিসহ পূজার যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান শেষ করে সন্ধ্যার আগেই আবার রথ টেনে নিয়ে ফিরে যায় নিজ নিজ মন্দির প্রাঙ্গণে। উল্টোরথ বা পুণ্যযাত্রার দিনও একইভাবে রথ টানা হয়। রথযাত্রার দশ দিন ধরে প্রতিটি মণিপুরি পাড়ায় মন্দিরে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং সবাইকে খিচুড়ি প্রসাদ দিয়ে আপ্যায়িত করার প্রথা চলছে। ভীড়ের মধ্যেও প্রতিটি রথ দেখার চেষ্টা করলাম। একশ চুরানব্বই বছর ধরে আয়োজিত হয়ে আসছে এই রথযাত্রার অনুষ্ঠান। এদিকে রথগুলোর নিজ দেবতা গৃহে ফেরার সময় হয়ে এলো। সবাই রথ নিয়ে ফিরে চলল।  আমরা রথ টেনে রথের মেলা ঘুরে দেখতে গেলাম। দোকান থেকেই নিমকি, কাটাগজা, খাজা, খইয়ের উফরা কিনে খেলাম। দেখতে দেখতে আমাদের সময় ফুরিয়ে এলো। এবার আমাদের ফিরতে হবে। ফেরার পথে পা বাড়ালাম।

যাবেন কীভাবে

ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে অথবা ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্তঃনগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনী এবং রাতে উপবন সিলেটের পথে ছোটে। ভাড়া ৩৬০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে। সেখান থেকে রিকশায় মেলায় যেতে ভাড়া ৬০ টাকা, সিএনজিতে ১২০ টাকা।

থাকবেন কোথায়

হোটেল রোজ ভিউ। ফোন : ০৮২১৭২১৪৩৯; দরগা গেটে হোটেল স্টার প্যাসিফিক। ফোন : ০৮২১-৭২৭৯৪৫; ভিআইপি রোডে হোটেল হিলটাউন। ফোন : ০৮২১৭১৬০৭৭; বন্দরবাজারে হোটেল মেট্রো ইন্টারন্যাশনাল। ফোন : ০৮২১-৭২১১৪৩; নাইওরপুলে হোটেল ফরচুন গার্ডেন। ফোন : ০৮২১৭১৫৫৯০।