আজ বিশ্ব সাইকেল দিবস। প্রতি বছর বিশেষ এই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালন করা হয়। মূলত ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একজন অধ্যাপক লেসজেক সিবিলস্কি বাইসাইকেল নিয়ে একটি প্রচারাভিযান শুরু করেন। তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল জাতিসংঘ বিশ্বে সাইকেলের সমর্থনে একটি দিন নির্ধারণ করবে। এই প্রকল্পটি একটি বড় আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত বাইসাইকেলের জন্য জাতিসংঘ একটি দিন নির্ধারিত করে। ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র সর্বসম্মতিক্রমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আওতায় ৩ জুনকে বিশ্ব সাইকেল দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
বিশ্বে প্রায় ১ বিলিয়ন সাইকেল রয়েছে—এ সংখ্যা গাড়ির সংখ্যার কয়েকগুণ বেশি। এখন বিশ্বের অনেক দেশে ব্যায়াম, অবসর ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন হিসেবে সাইকেল ব্যবহার করছে মানুষ। চলুন, দেখে নিই সাইকেল ব্যবহারে বিশ্বের সেরা কয়েক দেশের তালিকা।
চীন
চীনে বাইসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন। এ সংখ্যার কারণেই দেশটিকে বলা হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ বাইসাইকেল ব্যবহারকারী দেশ। সাংহাই শহরের ৬০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন সাইকেল ব্যবহার করে। হাংঝো ও চেংদু শহরে রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
আমস্টারডাম, নেদারল্যান্ড
সাইকেলবান্ধব বলতে যে শহরটির কথা প্রথমে চলে আসে, সেটি হলো নেদারল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডাম। নেদারল্যান্ডের সবচাইতে জনবসতিপূর্ণ শহর এটি। আর এই শহরের প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষের যাতায়াতের বাহন হিসেবে প্রথম পছন্দ সাইকেল। তাই আমস্টারডামকে সাইকেলের শহর বা দু চাকার শহরও বলা হয়ে থাকে। এ শহরে সাইকেল পার্কিংয়ের জন্য রয়েছে আলাদা সাইকেল স্টেশন। এমনকি শহরে রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট সাইকেল স্ট্যান্ডিং পার্ক। তবে এখানে সাইকেল পার্ক করার ক্ষেত্রে মানতে হবে নিয়মকানুন। নয়ত যত্রতত্র সাইকেল রাখলে বা নির্দিষ্ট জায়গায় পার্ক না করার কারণে পার্কবিহীন সাইকেলগুলো পাঠানো হয় সাইকেলের খোয়াড়ে। পরে উপযুক্ত মালিককে তথ্য প্রমাণ দিয়ে তা ফিরিয়ে দেয়া হয়।
জার্মানি
বলা হয়ে থাবে জার্মানিতে জনসংখ্যার প্রায় সম পরিমাণ সাইকেল রয়েছে। অবসরে ঘুরে বেড়ানো বা ভ্রমণের জন্য জার্মানিতে সাইকেল বেশ জনপ্রিয়। এ জন্য দেশটিকে ‘সাইকেল আরোহীদের দেশ’ বলা হয়। দেশটিতে আয়োজিত হয় বার্ষিক ডয়েচল্যান্ড ট্যুর ইভেন্ট। এ আয়োজনের সময় দেশজুড়ে রোমান্টিক রোড ও বার্লিন ওয়াল ট্রেইলের মতো রুটে সাইকেলপ্রেমীরা বেরিয়ে পড়ে। এভাবে জার্মানি সাইকেলকে পরিবহন, পর্যটন এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
কোপনেহেগেন, ডেনমার্ক
ডেনমার্কে সাইকেল ব্যবহার খুবই জনপ্রিয়। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন শহরকে বলা হয়ে থাকে দু চাকার যানের জন্য এক আদর্শ শহর। ডেনমার্কের অধিবাসীদের প্রতিটি পরিবারেই সাইকেল যেন এক বাধ্যতামূলক বাহন এবং প্রত্যেক পরিরিবারে তা থাকা যেন এক নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোনো পর্যটক কোপেনহেগেনে ভ্রমণে এলেই প্রথমে তার চোখে পড়বে শহরের বিভিন্ন স্ট্যান্ডে দাঁড় করে রাখা শত শত সাইকেলের সারি। সাইকেল চালানোর জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আলাদা সাইকেল লেন। কোপেনহেগেন শহরকে ২০১৫ সালে বিশ্বের সাইকেলবান্ধব শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দেশটির সরকার সাইকেলের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য রাস্তায় লেন, সাইকেল ব্রিজ এবং পার্কিং সুবিধায় বড় বিনিয়োগ করেছে। সেখানে ‘ট্যুর দে ডেনমার্ক’ নামের সাইকেল প্রতিযোগিতা খুব জনপ্রিয়।
সুইডেন
সুইডেনের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে থাকে। এর কারণে স্টকহোম, গোথেনবার্গ ও মলমো শহরে সাইকেলের বিশেষ পথ, পার্কিং সুবিধা এবং রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা রয়েছে। দেশটির গটল্যান্ড ও ওল্যান্ড দ্বীপে সাইকেল পর্যটন জনপ্রিয়।
প্যারিস, ফ্রান্স
সাইকেল চালানোর জন্য প্যারিস এক আদর্শ স্থান। এই শহরে প্রায় ১৮০০ সাইকেল স্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশন থেকে সাইকেল ভাড়া দেয়া হয়ে থাকে। ৩০ মিনিটের কম দূরত্বের জন্য সাইকেল আরোহীকে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয় না। চীনের পর এটির বিশ্বের বৃহৎ বাই সাইকেল রেন্টাল প্রোগ্রাম। শহরের সমতল রাস্তা, শহরের ব্যস্ততাহীন রাস্তায় সাইকেল চালানোর পক্ষে বেশ আরামদায়ক। সাইকেল চালানোর জন্য রয়েছে আলাদা সাইকেল লেন।
নরওয়ে
নরওয়েতে জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সাইকেল যাত্রার হার ১১ শতাংশ বেড়েছে। নরওয়ের, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকার মানুষ এবং বয়স্কদের মধ্যে ই-বাইকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বার্সেলোনা, স্পেন
সাইকেল আরোহীদের জন্য সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন জায়গা হিসেবে পরিচিত স্পেনের বার্সেলোনা শহর। শহরের পরিবহণ সংস্থা নিরাপদ সাইকেল চালানোকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ২০০৭ সাল থেকে এখানে রেন্ট সিস্টেমের আওতায় সাইকেল ভাড়া দেয়ার প্রোগ্রাম চালু হয়েছে, বর্তমানে এই প্রোগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। দু চাকার যানকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতিবছর মে মাসে বেশ আনন্দমুখর পরিবেশে বার্ষিক বাই সাইকেল সপ্তাহ পালিত হয়। শহরের পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এমন সাইকেল পথ নির্মাণ করা হয়েছে, যার জন্য অবশ্যই ভ্রমনার্থীকে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক।
সুইজারল্যান্ড
দেশটিতে ১২ হাজার কিলোমিটার সাইকেল পথ আছে। সুইজারল্যান্ডে ‘ট্যুর দে সুইস’ ও ‘ট্যুর দে রোমানডিয়া’ ইভেন্টের জন্য প্রতিবছর হাজারো সাইকেলপ্রেমী একত্র হয়।
