বিএসটিআইয়ে পরীক্ষা ঘাপলা

দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদানের পরীক্ষা নিয়ে বেশি বিতর্কের মুখে পড়েছে সংস্থাটি। সরকারের দুই পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় সরকারের দুই প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ফল আসার ঘটনা যেমন ঘটেছে; তেমনি বিএসটিআই যেসব পণ্যের মধ্যে কোনো ক্ষতিকর উপাদান পায়নি, সেগুলোতেই ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যাকটেরিয়া পেয়েছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের (ঢাবি) গবেষকরা। এমনকি ‘নি¤œমানের’ বলে ঘোষণা দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সেসব জনপ্রিয় খাদ্যপণ্যের অধিকাংশই ‘মানোত্তীর্ণ’ বলায় দ্বিধান্বিত ক্রেতারা। তা ছাড়া সারা বছর অভিযান না চালিয়ে রোজার মধ্যে কেন অভিযান চালায় সংস্থাটি এ প্রশ্নও উঠেছে।

বিএসটিআইয়ের এমন কর্মকা-ে অসন্তুষ্ট হাইকোর্ট। গত ২২ মে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ বিএসটিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিএসটিআইয়ের আইনজীবীকে বিচারক বলেন, ‘আপনারা কাজ করার দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু দায়িত্ব পালন করছেন না। আপনাদের পরীক্ষায় সত্য উদ্ঘাটন হচ্ছে না কেন? শুধু এসি রুমে বসে থাকবেন, তা হবে না। আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু আপনারা পারছেন না কেন?’

ফলে খাদ্যপণ্যের মান নির্ণয়ে বিএসটিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অন্য কোনো সংস্থার পরীক্ষার সঙ্গে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষার ফল না মেলায় বিএসটিআইয়ের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না ক্রেতারা। গতকাল বুধবার মগবাজারের একটি শপিংমলে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী এনায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন কোন দুধ কিনব? মিল্ক ভিটা, আড়ং না প্রাণের? পত্রিকায় দেখলাম বিএসটিআই ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় দুই ধরনের রিপোর্ট দিয়েছে। এর আগেও দেখেছি একবার এক পণ্যকে নি¤œমানের বলে পরক্ষণেই আবার মানোত্তীর্ণ ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের মান পরীক্ষায় বিএসটিআইয়ের এমন গড়িমসি কেন জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসটিআইয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নামিদামি পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে এক ধরনের চাপ তো আছেই। ৩৭ শতাংশের ক্ষেত্রেই পরীক্ষার ১০ প্যারামিটারের সবগুলো মানা হয় না। ১০ পয়েন্টের মধ্যে ৮ বা ৭ পেয়েছে এমন পণ্যকেও মানোত্তীর্ণ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। তা ছাড়া পণ্যের স্যাম্পল সংগ্রহ নিয়েও ঝামেলা আছে। দুইভাবে নমুনা সংগ্রহ করা হয়Ñ বাজার থেকে ও ফ্যাক্টরি থেকে। দুই নমুনায় দুই ধরনের ফল আসে। তখন আমরা নিজেরাও বিভ্রান্তিতে পড়ি।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিএসটিআইয়ের নিজস্ব ল্যাবরেটরি আছে। ১৮১টি পণ্য পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩৫টি বিশ^স্বীকৃত। তবে আমাদের ল্যাবরেটরি অতটা আধুনিক নয়। যেমনÑ দুধ একটি নতুন কনসেপ্ট। আমরা এখনো অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করতে পারছি না। এগুলো ঢুকাতে হবে। তা ছাড়া আমাদের লোকবলেরও ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। সারা দেশে মান নিয়ে কাজ করে ৩০ শতাংশ পদ ফাঁকা। কেন্দ্রেই ৬০ জনের মধ্যে মাত্র ২৭ জন আছে। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিছুটা গাফিলতি থেকেই যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক মো. মুয়াজ্জেম হোসাইনকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থার পরিচালক (সিএম) এস এম ইসহাক আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারও চাপে বা অন্য কোনো প্রভাবে এখানে পণ্যের মান নির্ণয় হয় না। সবগুলো প্যারামিটার মেনে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়। সুতরাং বিএসটিআইয়ের পণ্যের মান নিয়ে কারও কোনো বিভ্রান্তিতে পড়া উচিত নয়।

সর্বশেষ দুধের পরীক্ষা নিয়ে বিএসটিআই ও ঢাবির দুই ধরনের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, ঢাবি ও আমাদের পরীক্ষাপদ্ধতি এক নয়। ওরা অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর জোর দিয়েছে। আমরা পণ্যের সার্বিক মানের ব্যাপারটা দেখি। ওদের পরীক্ষার প্যারামিটার আমাদের থেকে আলাদা। তা ছাড়া ওরা যে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করেছে, সেটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। রিপোর্ট করলেই হয় না। কীভাবে কারা পরীক্ষা করল, দক্ষ গবেষক নাকি ছাত্ররা, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ মাসেই বিএসটিআইয়ের দুই দফায় পরীক্ষায় ৭৪ পণ্যের মান প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, প্রথম দফায় ৫২ ও পরে ২২টি পণ্য নি¤œমানের ছিল। ওগুলো আমরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছি। পরে মাত্র ১৬টা পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছি। এই সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি না। তা ছাড়া কেন করেছি, সেটাও ক্রেতাদের জানা উচিত। যেমনÑ হলুদের গুঁড়া মিহি ছিল না বলে নি¤œমানের বলেছিলাম। পরে তারা সেটা মিহি করেছে। তা ছাড়া নি¤œমানের পণ্যগুলো যেসব প্যারামিটারে নেগেটিভ, সেগুলো কিন্তু পজিটিভ করা অল্প সময়ের ব্যাপার। প্রতিষ্ঠানগুলো প্যারামিটার অনুযায়ী সেগুলো সংশোধন করেছে বলেই আমরা মানোত্তীর্ণ বলে ঘোষণা দিয়েছি।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, চিলে কান নিয়ে গেছে বলে চিলের পেছনে না ঘুরে প্রকৃত বিষয়টি সবাইকে বুঝতে হবে। আমরা চাই দেশি পণ্যগুলো বাজারে থাক। বিদেশি পণ্য যেন বাজার দখল করতে না পারে। আমরা ক্রেতাদের সেটা বোঝানোর চেষ্টা করছি। নির্দিষ্ট মানদ- মেনেই আমরা সব পণ্যের পরীক্ষা করি। এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই।

বিএসটিআইয়ের এই যুক্তি মানতে নারাজ বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব)। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুর কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএসটিআইয়ের লোকজনকে ম্যানেজ করা যায়, অন্য সংস্থার লোকজনদের ম্যানেজ করা যায় না। সমস্যাটা এখানেই। এটা ল্যাবরেটরির দোষ না। দোষ প্রতিষ্ঠানের। ওরা (বিএসটিআই) বলে লোকবল নেই। স্যাম্পল সংগ্রহের জন্য মাঠে যেতে পারে না। কোম্পানিগুলো তাদের বেস্ট স্যাম্পল ওদের দেয়। ওরা পরীক্ষা করে। ফলে মান ভালো আসে। অনেক আগে আমরাও একবার খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করেছিলাম। তখনো বিএসটিআইয়ের সঙ্গে আমাদেরটা মেলেনি। ওরা পণ্যে কোনো ক্ষতিকর দিক পায়নি।

হুমায়ুন কবির বলেন, বিএসটিআইয়ের সংশোধন হওয়া উচিত। কোম্পানির ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ না করে প্রকৃত পরীক্ষা করা উচিত। খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর দিক আছে কি নাÑ তা যাচাই করার দায়িত্ব সবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ক্ষতিকর উপাদান পেল, সেখানে বিএসটিআই বলল আশঙ্কাজনক কিছু নেই। তা হলে বিএসটিআইয়ের উচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কথা বলা। দেখা তারা কোন পদ্ধতিতে পরীক্ষা করল। পণ্যের মান নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার দায়িত্ব বিএসটিআইয়ের।

অনুরূপ মন্তব্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের। সংস্থার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব খাদ্যপণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একেক ধরনের ফল আসছে, বিএসটিআই এসব পণ্যের মান নির্ধারণ করে। তাদেরই উচিত এসব বিভ্রান্তি দূর করা।

এই কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা করে দেখল তরল দুধে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক আছে। বিএসটিআই বলছে নেই। কেন এমন হচ্ছে, তা ওই দুই প্রতিষ্ঠান বলতে পারবে। কে কোন পদ্ধতিতে ও প্যারামিটার মেনে পরীক্ষা করেছে, তারাই জানে। আমরা তথ্য-উপাত্ত পেলে বলতে পারব। তবে আমরাও খাদ্যপণ্য নিয়ে বিশেষ করে দুধ নিয়ে কাজ করছি। হাতে ফল এলে জানাব।

বিএসটিআইয়ের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। তিনি বলেন, প্রত্যেক সরকারি সংস্থার উচিত বিবেকের দায় থেকে কাজ করা। আমরাও নৈতিকতা থেকেই কাজ করি। আমাদের তরল দুধ নিয়ে যে পরীক্ষা, সেটা ঠিকমতোই করতে পেরেছি। এটা নিয়ে অন্য কারও উষ্মা প্রকাশের কারণ নেই। আমরা কারও কাছে নতি স্বীকার করি না। আমাদের কোর্সেই ফুড টেকনোলজি ও কসমেটিক টেকনোলজি রয়েছে। আমরা সেটা শিক্ষার্থীদের পড়াই। গবেষণার জন্য পরীক্ষা নিয়মিত করি। কিন্তু প্রকাশ করি না। কারণ ব্যবসায়ীদের গঞ্জনার মধ্যে পড়তে হয়। এবার করেছি। কারণ খাদ্যপণ্যের মান নিয়ে বিভ্রান্তি চলছে। আমরা অবাক হয়েছি দুধের মধ্যে এত পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্ট কীভাবে এলো। বিশেষ করে সাবান (ডিটারজেন্ট) এলো কীভাবে এটা আমরা বের করতে পারিনি।

এই শিক্ষক বলেন, আমাদের পরীক্ষা নিয়ে সবার জন্য এতই উষ্মা, কেন প্রকাশ করলাম সে প্রশ্ন, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন থেকে নিয়মিত প্রকাশ করব। হলুদের মধ্যে টেক্সটাইল রং মেশানো হচ্ছে। সুতরাং এভাবে খাদ্যপণ্যের বাজার ছেড়ে দেওয়া যায় না।