মানবতাবিরোধী অপরাধ

রণদাপ্রসাদ হত্যায় রাজাকার পুত্র মাহবুবের ফাঁসির আদেশ

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় টাঙ্গাইলের দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা (আরপি সাহা) হত্যামামলার একমাত্র আসামি মাহবুবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল বৃহস্পতিবার আসামির উপস্থিতিতে ২৩৫ পৃষ্ঠার এ রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি আমির হোসেন ও বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার। এদিকে এ মামলার আসামির ফাঁসির রায় শুনে আরপি সাহার স্বজন ও টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা রণদাপ্রসাদ সাহার পৈতৃক নিবাস ছিল টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। কুমুদিনী হাসপাতালসহ সেখানে একাধিক শিক্ষা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। ‘ভারতেশ্বরী বিদ্যাপীঠ’ স্থাপন করে ওই এলাকায় নারী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেন রণদাপ্রসাদ সাহা। এটি পরে ভারতেশ্বরী হোমসে রূপলাভ করে। একসময় নারায়ণগঞ্জে পাটের ব্যবসা এবং সেখানকার খানপুরের সিরাজদীখানে বসবাস শুরু করেন তিনি। টাঙ্গাইলের কুমুদিনী কলেজ, মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ এবং কুমুদিনী মহিলা কলেজেরও প্রতিষ্ঠাতা রণদাপ্রসাদ সাহা।

রণদাপ্রসাদ সাহা ও তার ছেলে ভবানীপ্রসাদ সাহাকে অপহরণ ও হত্যা এবং গণহত্যাসহ প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিনটিতেই টাঙ্গাইলের মাহবুবুরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে রায়ে। গত ২৪ এপ্রিল এই মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে মর্মে তা অপেক্ষমাণ রেখেছিল আদালত।

গত বছরের ২৮ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ আমলে নেয় আদালত। বিচারকালে আসামির বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে ১৩ জন সাক্ষ্য দেয়।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী গাজী এম এইচ তামিম। গতকাল রায় ঘোষণার সময় রণদাপ্রসাদ সাহার পুত্রবধূ স্মৃতি সাহা ও নাতি রাজীব সাহাও উপস্থিত ছিলেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত বলেন, ‘রণদাপ্রসাদের মতো একজন দানবীরকে হত্যা ও গণহত্যার অভিযোগে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। আদালত বলেছে, এই হত্যাকাণ্ডকে সহজভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’

রণদাপ্রসাদের নাতি রাজীব সাহা বলেন, ‘আমাদের পরিবারের জন্য এটি একটি বোঝা হয়ে ছিল। আজ এই রায়ে সেই বোঝা নেমে গেছে। আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি।’

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আইনজীবী গাজী এম এইচ তামিম বলেন, ‘আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ, ন্যায়বিচার পাইনি। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।’

আসামি মাহবুবুর একাত্তরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন বলে রায়ে উঠে এসেছে। তার বাবা ছিলেন সে সময় ওই এলাকার শান্তি কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ। মাহবুবুর মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমসের আশপাশের এলাকা, নারায়ণগঞ্জের খানপুরের কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ও তার আশপাশ এলাকা এবং টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজ এলাকায় অপরাধ সংঘটন করেন বলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, আসামি মাহবুব ১৯৭১ সালের ৭ মে মধ্যরাতে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২০-২৫ জনকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বাসায় গিয়ে রণদাপ্রসাদ সাহা, তার ছেলে ভবানীপ্রসাদ সাহা ও ঘনিষ্ঠ সহচর গৌর গোপাল সাহাসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যার পর মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। পরে তাদের মরদেহ আর পাওয়া যায়নি।

মির্জাপুরে স্বস্তি : দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা হত্যামামলায় মাহবুবুর রহমানের ফাঁসির রায় হওয়ায় গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত মির্জাপুরের কুমুদিনী চত্বরে আনন্দ বিরাজ করে। চত্বরে উপস্থিত জনতা এ নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন।

কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার পরিচালক (শিক্ষা) ভারতেশ্বরী হোমসের সাবেক অধ্যক্ষ ও একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রতিভা মুৎসুদ্দি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারের রায়ে আমরা খুবই কৃতজ্ঞ। এই সরকার বিচারের ব্যবস্থা করেছে। আমরা চাই সব শহীদের খুনির বিচার হোক।’ এ রায় দ্রুত কার্যকরেরও দাবি জানান তিনি।

মির্জাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর এনায়েত হোসেন মন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন যুগান্তকারী রায়ে শুধু আমি নই মির্জাপুরবাসীও খুশি হয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সময় ওই রাজাকারের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তাদের বের করে বিচার করলে আরও ভালো হতো।’

মির্জাপুর পৌরসভার মেয়র সাহাদৎ হোসেন সুমন বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বহুদিন পর হলেও এমন একটি রায়কে স্বাগত জানাই।’