সুপারস্টারদেরও চূড়ান্ত সিলমোহর বিশ্বকাপ

বার্মিংহামে পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচটা দেখতে দেখতে ২৭ বছর আগের একটা দৃশ্য মনে পড়ে যাচ্ছিল। দুদিন পর বিশ্বকাপ ফাইনাল, তাই পাকিস্তান মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে প্র্যাকটিসে এসেছে। কিন্তু মাঠ একদম ফাঁকা। কারণ, কেউ জানত না যে পাকিস্তান সেখানে অনুশীলনে আসবে। আমি একটা নোটবুক নিয়ে এসেছি পাকিস্তানের অধিনায়ককে ধরব বলে। কারণ, আগের দিন ইংল্যান্ড দল জিতে ফাইনালে উঠেছে। এ নিয়ে তাকে ফোন করলে সেই পরে ফোন ধরবেন বলে জানান। কিন্তু তিনি আর ধরেননি। আর পরে ফোন দেওয়ার পর তাদের অপারেটর বলেছিলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফোন দিলেও নাকি দেওয়া বারণ আছে।

সাধারণত ইমরান খান ইন্টারভিউ দেওয়ার মুডে থাকলে সাংবাদিকদের কিছুই করতে হয় না, টেপ-রেকর্ডারটা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া। আমি ইমরানকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনারা যে কাল জিতেছেন তখন ভারতেও প্রচুর বাজি ফুটেছে। আর এমন জায়গায় ফুটেছে যেগুলো পাকিস্তানের জন্য খুব প্রিয় জায়গা নয়।’ তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ‘তাই?’ তাকে বললাম, ‘এই যে বিশ্বকাপে ভারত এত খারাপ করল, ভারতবর্ষ জানতে চায়, যদি আপনি ভারতের অধিনায়ক হতেন তাহলে কী পরিবর্তন আনতেন ভারতীয় দলে?’ প্রশ্নটা শুনে তিনি অন্তত দেড় মিনিট কোনো কথা বলেননি। পরে বললেন, ‘এই প্রশ্নটা আমায় জিজ্ঞেস করছেন, আমি তো আমার দল নিয়ে বিদ্ধ হয়ে আছি। উপমহাদেশের দলের অধিনায়কত্ব করা মহামুশকিল। আর ভারতবর্ষের অধিনায়কত্ব করা তো বিশাল ঝামেলার। এখানে কতরকম ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা। আমি তো ভাবতে পারি না আমি কীভাবে তাদের দলবদ্ধ করে রাখতাম।’ বললাম, ‘আমাদের দেশে সবাই আপনাকে অধিনায়ক হিসেবে খুব সম্মান করেন। যেখানে আজহারউদ্দিন কিছুই করতে পারেননি সেখানে আপনার কাছ থেকে সবাই ফর্মুলা জানতে চায়।’ ইমরান তখন বললেন, ‘দেখুন, আমি ঠিক জানি না। আমি আমার দল নিয়ে এবার যে ঝামেলা পোহাচ্ছি তা পুরো ক্যারিয়ারেও পোহাতে হয়নি। তবে আমি হয়তো স্পেশালিস্ট খেলোয়াড়দের বেছে নিতাম, উইকেটটেকিং বোলার নিতাম, নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতাম, খেলোয়াড়দের উদ্বুদ্ধ করতাম। তবে তাও আমি ভারতের সেরা অধিনায়ক হতে পারতাম কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’

বার্মিংহামে সরফরাজকে দেখে ইমরান খানের কথা মনে পড়ছিল। এই সরফরাজকে কয়দিন আগে এত গালাগাল দিয়েছে পাকিস্তানের প্রেস। কত কথা শুনিয়েছেন সাবেক পাকিস্তানিরা। আসলে আমি বলব উপমহাদেশের অধিনায়ক হলে একজন অধিনায়ককে কত কষ্ট করে খেলতে হয়। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা অনেক ভাগ্যবান। নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে দলটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গেও তার সম্পর্ক খুব ভালো। তিনি তাদের সঙ্গে দুষ্টুমি, মজা করেন। অন্য কোনো দেশের অধিনায়ককে নিয়ে এমন ভাবাই যায় না।

পাঠক জানলে অবাক হবেন, ২০১৫-এর বিশ্বকাপের আগে বিরাট কোহলি একজন সাংবাদিককে প্রচুর গালাগাল করেন। কারণ ২০১৪ ইংল্যান্ড সফরে কোহলি যখন রান পাচ্ছিলেন না তখন ওই সাংবাদিক লিখেছেন আনুশকা-বিরাট একসঙ্গে রাত কাটিয়েছে, তাও বিয়ের আগে। বিরাট দলের নিয়ম ভেঙেছেন। এজন্য ওই সাংবাদিক দলের ম্যানেজারকে জানিয়ে বিরাটের শাস্তির জন্য বলেন। বলেন, বিরাটের খেলা থেকে মন সরে গেছে। সাংবাদিককে গালাগাল করে বিরাট এর বদলা নেন। মজার ব্যাপার হলো, ওই সাংবাদিক সেই সাংবাদিক নন যিনি বিরাটের বিপক্ষে এমন লিখেছেন। তখন বিরাট তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন।

বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের সাংবাদিকের সঙ্গে খেলোয়াড়দের ভালো সম্পর্ক নেই। এর কারণ হলো সাংবাদিক বেড়ে যাওয়া আর খেলোয়াড়রা এখন খুব অল্প বয়সে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যান। যেহেতু খেলোয়াড়রা বিদেশি লিগ খেলে সচ্ছল হয়ে যান তাই তারা ইনসিকিউরিটি ফিল করেন না। ক্রিকেটাররা নিজেদের মধ্যে একটা আলাদা জগৎ গড়ে তোলেন, যেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষেধ।

এবারের আসরে একটা জিনিস খুব ভালো লেগেছে। এত চাকচিক্য নিয়েও কিছু কিছু খেলোয়াড় আছে যারা নিজেদের ব্যক্তিগত ইমেজ দিয়ে ক্রিকেটের প্রতি নিজেদের নিবেদন প্রকাশ করেন। নিজের স্কিল, মানসিক শক্তি সবকিছুর ওপর বিশ্বাস রেখে নিজের আরও উন্নতি করতে চাওয়ার ইচ্ছে। নিজেকে বড়মঞ্চে বিশালভাবে প্রকাশ করার আকুতি। সত্যিই মুগ্ধ করেছে। এটা আসলে বিশ্বকাপের একটা অদৃশ্য বাগান, যেখানে ফুল ফুটে রয়েছে তার নিজস্ব বাহার নিয়ে।

বিরাট কোহলি! কী অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তি নিয়ে উন্নতি করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর নিজের অসাধারণ স্পোর্টসম্যানশিপ দেখিয়ে চলেছেন। কেউ কি এমন দেখাত? কোর্টনি ওয়ালশ যদি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের হয়ে খেলতেন। তাহলে আমার মনে হয় তিনিও তার স্পোর্টসম্যানশিপ দেখাতেন না। কোনো ব্যাটসম্যান বেরিয়ে গেলেও ঠিক আউট করে দিতেন। সেখানে বিরাট কোহলি কি না আমিরের বলে হালকা ব্যাটের কানা লেগেছে ভেবে মাঠ ছেড়েছেন। পরে যখন বুঝলেন যে আউট ছিলেন না, তখন ইনডোরে যেভাবে এই শটের শ্যাডো করছেন, তাতে বোঝা যায়Ñ তার কাছে এই টুর্নামেন্টের মাহাত্ম্য কী। ‘এই টুর্নামেন্টে যদি আমি ফুটে উঠতে না পারি তাহলে আমার খেলে কী লাভ’। এসব দেখে মনে হয় ক্রিকেটে টাকাটাই সব নয়।

সাকিব আল হাসান! কী টুর্নামেন্টটাই না খেলছেন। যখন ক্রিকেট কিংবদন্তিরা তাকে নিয়ে কথা বলেন তখন বাঙালি হিসেবে কী যে ভালো লাগে। আসলেই তো দুই বাংলা মিলিয়ে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ১৯৩৯ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার অনেকে রঞ্জি ট্রফি খেলেছেন। কিন্তু সাকিবের মতো কেউ না পদ্মার এদিকে হয়েছে, না গঙ্গার এদিকে। জানি না তিনি জীবনের শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন কি না। তবে তিনি এই বিশ্বকাপের আগে আইপিএলে খেলার সময় ব্যক্তিগত ট্রেনার নিয়ে অনুশীলন করেছেন। তিনি বিশ্বকাপের জন্য লগ্নি করেছেন। ওজন কমিয়ে নতুন অবতারে এসে কী ব্যাটিংটাই না করছেন। তার মতো খেলোয়াড়, যার টাকার কোনো অভাব নেই, তারকাখ্যাতির অভাব নেই, নিজেকে প্রমাণের আর দরকার নেইÑ সেই তিনি কি না এই বিশ্বমঞ্চে নিজেকে নতুন করে প্রমাণের জন্য লড়াই চালিয়ে গেছেন।

ডেভিড ওয়ার্নার যখন নিষিদ্ধ ছিলেন তখন একবার তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন তিনি বলেন, ‘আমাদের স্যান্ডপেপার-গেইটের বিতর্ক নিয়ে এত কথা, কিন্তু প্রোটিয়ারা কী করে বলে সুইং করেছিল সেটা নিয়ে কেন কোনো উচ্চবাচ্য নেই! এজন্য আমার যে সম্মানহানি হলো, যতগুলো রান চলে গেল সব আমি ফিরিয়ে আনব। এর বদলা আমি মাঠেই নেব। আইসিসি হয়তো ভারতীয়দের সুবিধা দিতে স্পিনিং ট্র্যাক বানাবে, তাও আমি নিজেকে প্রমাণ করব।’ কী সংকল্প! ঠিকই বড় মঞ্চে নিজেকে মেলে ধরলেন ডেভিড ওয়ার্নার।

কী চমৎকারভাবে বিশ্বকাপে নিজেকে এনেছেন জো রুট। তিনি কিছুটা সাবেকি ক্রিকেটার। তিনি এখনকার খেলোয়াড়দের মতো ওয়ানডে বা টি-টুয়েন্টি ঘরানার নন। টেস্ট দলের অধিনায়ক। কিন্তু ইংল্যান্ডের এই নতুনধারার ওয়ানডের মাঝে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন ঠিকই। ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার এক হোটেলের কনফারেন্স রুমে ইংল্যান্ড এই নতুন মডেল দাঁড় করায়। যেখানে অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন। সেখানে জো রুটের একটা দারুণ অবদান ছিল। একটা টেস্ট টিমের ক্যাপ্টেন হয়ে তিনি মরগানকে সহায়তা করেছিলেন তখন। নিজেকে এই ওয়ানডে দলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। আমার মনে হয় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইংল্যান্ডের হারের জন্য স্টার্কের স্টোকসকে করা ডেলিভারি মুখ্য নয়। রুটকে আউট করা বলটাই মুখ্য ছিল। রুট থাকলে কিন্তু খেলাটা বের করে নিতেন।

আগেও বলেছি, বিশ্বকাপে বসন্ত এনে দিয়েছে বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু উইন্ডিজের বসন্ত মিলিয়ে গেছে বেশি আগে। দুর্ভাগ্য যে জেসন হোল্ডারের মতো অধিনায়ক থাকা সত্ত্বেও ওরা ভালো করতে পারেনি। সাবেক ক্যারিবীয়রা যেখানে আশা করেছিল স্বর্ণালি সময় ফিরে এসেছে সেখানে হয়তো আন্দ্রে রাসেলের ইনজুরি তাদের ভুগিয়েছে। সব মিলিয়ে কোথাও যেন একটা গ-গোল হয়ে গেল।

আসলে বিশ্বমঞ্চের ধরনটাই আলাদা। তাই তো এত সুন্দর ব্যাটিং মডেল নিয়ে আসা সত্ত্বেও নাসের হুসেইনকে ইংল্যান্ডের জন্য লিখতে হয় যে, তাদের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আর বিশ্বকাপের পার্থক্য বুঝতে হবে। ইংল্যান্ডে একটা ক্রিকেট ফাউন্ডেশনে গিয়েছিলাম। যেটা রাজস্থান রয়ালসের। একটা বাঙালি ছেলে তা পরিচালনা করছেন। যেখানে বাচ্চাদের শুরু থেকে শেখানো হচ্ছে শুধু মারতে। আক্রমণ করতে। এটাই হচ্ছে আধুনিক ক্রিকেটের সিস্টেম। মাথা সোজা রাখো আর যত জোরে পারো মারো। ডট বল উঠিয়ে দাও খেলা থেকে। যে দেশ এই খেলার প্রচলন করল সে দেশ কি না এবার তিনটি ম্যাচ হেরে বাপি বাড়ি যা-এর মতো দশায় পড়েছে।

এই বিশ্বকাপ অনেক দিক দিয়ে আমাকে ১৯৯২-এর বিশ্বকাপকে মনে করাচ্ছে। তবে তখন বাংলাদেশ ছিল না। আর এবার বাংলাদেশ শুধু নেই, প্রতিপক্ষকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আমি মনে করি যদি বাংলাদেশ সেমিফাইনাল যায় তাহলে এটা তাদের জন্য টেস্ট ম্যাচ জেতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটকে যতই মর্যাদা দিন না কেন, দিন শেষে খেলোয়াড়রা মর্যাদায় অভিহিত হোন তাদের ওয়ানডে সফলতা দিয়ে। এই যে ধরুন কপিল দেব। কত কত ম্যাচ জিতিয়েছেন। ৪৩৪ উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু লোকে কী বলে, জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ১৭৫। ইমরান খানকে মানুষ চেনে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে। ভিভ রিচার্ডসকে চেনে ১৯৭৯-এর ফাইনালের সেঞ্চুরি দিয়ে। ক্লাইভ লয়েডকে চেনে দুবারের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে। আসলে বিশ্বকাপটা তাইÑ দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যক্রমে ক্রিকেটারদের বেঞ্চমার্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাইকে আগে এটাই দেখাতে হয়। সেদিক থেকে এবারের বিশ্বকাপ জমে উঠেছে। যে আবহাওয়াকে শুরুতে আমরা দোষারোপ করেছি। সেটাও কিন্তু বিশ্বমঞ্চে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

এবারের আসরে খেলোয়াড়দের চেষ্টা, নিবেদন দেখে বলা যায়Ñ তারা শুধু থলি ভরে অর্থ নিতে এই বিশ্বকাপ খেলছে না। সাকিব আল হাসান, কেন উইলিয়ামসন, ডেভিড ওয়ার্নার বা বিরাট কোহলিÑ এরা বারবার দেখাচ্ছেন ক্রিকেটীয় কীর্তি ডলারের চেয়েও অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে। এটাই সারা পৃথিবীতে যারা ক্রিকেট খেলছে বা এই পথে আসছে তাদের কাছে একটা অভিজ্ঞতা হিসেবে অর্জিত হচ্ছে। একদিকে বিশ্বকাপের খ্যাতি রয়েছে আরেকদিকে রয়েছে বিশ্বকাপের বার্তা। এই বার্তাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বার্তাটা যে পৌঁছাচ্ছে তাদের পক্ষ থেকে আমি একজন ক্রিকেট লেখক হিসেবে খুব রোমাঞ্চিত বোধ করছি।