মেট্রোরেল ছুটবে নতুন দুই গন্তব্যে

মেট্রোরেলে চড়ে যাওয়া যাবে রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। এতে গতি আসবে নগর জীবনে। এজন্য মেট্রোরেল সংক্রান্ত আরও প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫ নামে আলাদা আলাদা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বিমানবন্দর এলাকা থেকে কমলাপুর ও ভাটারা থেকে হেমায়েতপুর যাওয়া যাবে। মেট্রোরেলের এই লাইন দুটির বড় অংশ যাবে মাটির নিচ দিয়ে। ফলে উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সাবওয়ে বা পাতাল রেলের যাত্রা শুরু হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, মেট্রোরেলের এ সংক্রান্ত দুটি আলাদা প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ডিপিপি থেকে জানা গেছে, মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য হবে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার। এর আওতায় বিমানবন্দর এলাকা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার হবে মাটির নিচ দিয়ে। বাকিটুকু এলিভেটেড বা মাটির ওপর দিয়ে হবে। অন্যদিকে মেট্রোরেল লাইন-৫-এর আওতায় সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত মোট ২০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৪ কিলোমিটার হবে পাতাল রেল। বাকি ছয় কিলোমিটার এলিভেটেড বা উড়াল পথ। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে শুরু হয়ে  সেনানিবাস হয়ে ভাটারায় গিয়ে প্রকল্পটি শেষ হবে।

প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এ জন্য বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা দেবে জাপানের সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি সহায়তাও দেবে সংস্থটি। মোট ব্যয়ের মধ্যে মেট্রোরেল লাইন-১-এর জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা দেবে ৩৩ হাজার ৯৪ কোটি টাকা, বাকি ১৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে। চলতি বছর থেকে ২০২৭ সাল নাগাদ এর কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এই পথে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারবে, যা পরবর্তী সময়ে ১৯ লাখে উন্নীত হবে।

অন্যদিকে মেট্রোরেল লাইন-৫-এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হবে ১০ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা আর জাইকা ঋণ হিসেবে দেবে ৩০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২৮ সাল নাগাদ এর কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য সুবীর কিশোর চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প বিষয়ে আগেই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা হয়েছে। সভায় প্রকল্প বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো সংশোধন করে এবার চূড়ান্ত ডিপিপি পাঠানো হয়েছে। সব ঠিক থাকলে আগস্টের মধ্যেই প্রকল্প দুটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হবে।

উল্লেখ, বর্তমানে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলমান ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্পের কাজ চলছে। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় প্রকল্পের কাজ কিছুটা পিছিয়ে যায়। তবে ২০২১ সাল নাগাদ এই প্রকল্পের প্রথম অংশ উদ্বোধন করা হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ে মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠবে বলে মনে করেন অনেকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে দুটি বিষয় দেখতে হবে। মেট্রোরেলে আন্তঃসংযোগ হচ্ছে কি না। কারণ একজন যাত্রী মেট্রোরেল থেকে নেমে অন্যত্র কীভাবে যাবে সেটা দেখতে হবে। আন্তঃসংযোগ না থাকলে জনজট তৈরি হবে। মেট্রোর উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না। দ্বিতীয়টি হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ে মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাবে। তিনি বলেন, মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রাধান্য না দিয়ে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে যাওয়াই উচিত নয়। চলমান মেট্রোর অভিজ্ঞতা নিয়ে জনদুর্ভোগ কমাতে অবশ্যই পদক্ষেপ থাকা উচিত। এ ছাড়া দ্রুত ও যথাসময়ে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে। মনিটরিং ঠিকঠাক হলে জাপানকে দিয়ে এটা সম্ভব।

যা থাকছে নতুন দুই মেট্রোরেলে :

মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্প : এ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার পথটি বিমানবন্দর রুট এবং পরের ধাপে কুড়িল-বসুন্ধরা হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত থাকবে। এ রুটে ১২টি স্টেশন থাকবে। সেগুলো হলোÑ শাহজালাল বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, বারিধারা (নতুন বাজার), উত্তর বাড্ডা, গুলশান ১, বাড্ডা (হাতিরঝিল), রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।

এ প্রকল্পে নতুন বাজার-বারিধারা স্টেশনের সঙ্গে এমআরটি-৫-এর রুটের আন্তঃসংযোগ থাকবে। এজন্য শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত স্টেশন পর্যন্ত এলিভেটেউ বা উপর দিয়ে মেট্রোরেল হবে।

দ্বিতীয় ধাপে খিলক্ষেত স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক এবং বারিধারা নতুন বাজার পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে। বারিধারা এলিভেটেড স্টেশন থেকে উত্তর বাড্ডা, গুলশান-১, বাড্ডা, রামপুরা স্টেশন পর্যন্ত এলিভেটেড রেলপথ হবে। রামপুরা এলিভেটেড স্টেশন থেকে মালিবাগ, রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে।

পূর্বাচল রুটে ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার পথে ৯টি স্টেশন থাকবে। পূর্বাচলগামী অংশটি বারিধারা নতুন বাজার থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা (পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি), মাস্তুল, পূর্বাচল পশ্চিম, পূর্বাচল সেন্ট্রাল, পূর্বাচল টার্মিনাল (পূর্বাচল সেক্টর-৭) পর্যন্ত হবে। এই পথে নতুন বাজার বারিধারা এলিভেটেড স্টেশন থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক হয়ে বসুন্ধরা পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল হবে। তবে বসুন্ধরা স্টেশনটি এলিভেটেড স্টেশনে থাকবে এবং মাস্তুল, পূর্বাচল ওয়েস্ট পয়েন্ট, পূর্বাচল সেন্ট্রাল ও পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত এলিভেটেড মেট্রোরেল হবে। ফলে এ রুটে নতুন বাজার ও যমুনা ফিউচারপার্ক স্টেশন দুটো আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে এবং বসুন্ধরা থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত সাতটি স্টেশন হবে এলিভেটেড।

মেট্রোরেল লাইন-৫ : এটি হবে দ্বিতীয় আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল। এ পথে দুটি রুট। একটি রাজধানীর উত্তর দিক থেকে এবং অপরটি দক্ষিণ দিক থেকে। উত্তর দিক থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে। ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি স্টেশন আন্ডারগ্রাউন্ডে ১৪ কিলোমিটার পথজুড়ে হবে। বাকি পাঁচটি স্টেশন এলিভেটেড অবস্থায় ছয় কিলোমিটার পথজুড়ে থাকবে। অপরদিকে দক্ষিণ দিক থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে মোট আটটি স্টেশন থাকবে, যার পুরোটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে হবে। উত্তর দিকের স্টেশনগুলো হলোÑ হেমায়েতপুর (সাভার), বলিয়াপুর, বিলামালিয়া (মধুমতি), আমিন বাজার, গাবতলী, দারুসসালাম (টেকনিক্যাল), মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর ১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুন বাজার ও ভাটারা। এ স্টেশনগুলোর মধ্যে আমিনবাজার থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত ৯টি স্টেশন আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং বাকি স্টেশনগুলো এলিভেটেড হবে।

দক্ষিণ দিকের স্টেশনগুলো হচ্ছে গাবতলী, আদাবর, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, কারওয়ানবাজার, হাতিরঝিল, দক্ষিণ বাড্ডা ও আফতাব নগর। এর সবকটি স্টেশনই হবে আন্ডারগ্রাউন্ডে।