কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা

মামলা তদন্তে আস্থা নেই ফুলনের পরিবারের

দগ্ধ ফুলন রানী বর্মণ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বাবা-মাকে বলেছিলেন, ‘আগুনে পোড়ার যন্ত্রণা অনেক কঠিন। আমি আর আগুনে পুড়তে চাই না। তোমরা মরার পর আমাকে আর আগুনে পুড়ো না।’ মেয়ের কথা রেখেছেন বাবা যোগেন্দ্র বর্মণ। ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী লাশ সৎকার না করে গত বুধবার রাত ৮টায় নরসিংদী শহরের ঘোড়াদিয়া শ্মশানে তাকে সমাহিত করা হয়। চোখের জলে ফুলনকে শায়িত করেন বাবা যোগেন্দ্র বর্মণ, বড় ভাই সুমন বর্মণ, স্বজন, সহপাঠী ও এলাকাবাসী। এ সময় এলাকাবাসী ও সহপাঠীরা এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। এদিকে মামলার তদন্তে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছে ফুলনের পরিবার। তারা বলছে, অভিযোগ আমলে না নিয়ে উল্টো তাদের স্বজনদের ফাঁসানো হচ্ছে।

গত ১৩ জুন রাতে শহরের বীরপুরে ফুলনের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ২২ বছর বয়সী এই তরুণী গত বুধবার ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান। গত বছর নরসিংদী উদয়ন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ফুলন। পছন্দের প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ে ভর্তি হতে না পারায় এবার সেজন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।

ফুলনের স্বজনরা সে সময় বলেছিলেন, এক আত্মীয়র সঙ্গে সেদিন রাতে দোকানে কেক কিনতে গিয়েছিলেন ফুলন। কেক কিনে দিয়ে ওই আত্মীয় তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে চলে যান। বাড়ির কাছে পৌঁছালে কয়েকজন মুখ চেপে ধরে ফুলনকে পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। পরে চিৎকার শুনে স্থানীয়রা তাকে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করেন।

এ ঘটনায় ফুলনের বাবা অজ্ঞাত দুজনকে আসামি করে সদর মডেল থানায় মামলা করেন। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সঞ্জীবসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজু সূত্রধর, ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ বর্মণ ও আনন্দকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা তিনজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল গাফফার বলেন, আদালতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, ফুলনের বাবা যোগেন্দ্রর সঙ্গে প্রতিবেশী সুখ লাল ও হীরা লালের বাড়ির জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে এলাকায় সালিশ-দরবার হয়েছে। এরই জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ফুলনের গায়ে আগুন দেয় তার ফুফাতো ভাই ভবতোষ। সহযোগিতা করে তার দুই বন্ধু।

এদিকে এ মামলার তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ফুলনের পরিবার। তার মা অঞ্জলী বর্মণ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাড়ি নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী সুখ লাল ও হীরা লালের সঙ্গে ঝামেলা ছিল। আমাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল, বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলবে ও এলাকা থেকে বিতাড়িত করবে। ফুলন মৃত্যুর আগে ভবতোষকে নয়, প্রতিপক্ষ সৌরভ ও তার পরিবারকে আগুন দেওয়ার জন্য দায়ী করে গেছেন।’ তার ভাই সুমন বর্মণ বলেন, ‘আমরা ফুলন হত্যার জন্য যাদের সন্দেহ করছি পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেনি। প্রথমে তারা আমার শ্যালককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু ঘটনার সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি পুলিশ। পরে তারা আমাদের ভাই ও তার বন্ধুদের গ্রেপ্তার করেছে। ভবতোষ ও তার বন্ধুরা ভয় পেয়ে দোষ স্বীকার করেছে কি না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। তাই আমি তাদের সাথে কথা বলতে চাই। দোষী যেই হোক আমরা অবিলম্বে প্রকৃত অপরাধীর বিচার চাই।’

ফুলনের বাবা যোগেন্দ্র বর্মণ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করে বিচার করতে হবে। হত্যার বিচার হলে আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে।’

তবে তদন্তকে সঠিক উল্লেখ করে জেলার পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন (বিপিএম) দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনজন আসামি আলাদা আলাদাভাবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় মিলও পাওয়া গেছে। তাছাড়া পুলিশের তদন্তে আসামিদের পরস্পর যোগাযোগ ও তাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশের কাছে ফিজিক্যাল এভিডেন্সও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা ফুলনের পরিবারের পাশে ছিলাম। পুলিশের পক্ষ থেকে চিকিৎসার সব ব্যবস্থার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও সহায়তা করা হয়েছে। তারপরও তদন্ত চলমান। তদন্তে যদি কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’