হঠাৎ অপরাধ বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন পুলিশ

দেশে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে অপরাধ। প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খুন, ধর্ষণ, অপহরণসহ নানা ধরনের ঘটনা ঘটছে। প্রকট আকার ধারণ করেছে শিশু নির্যাতন। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় উদ্বিগ্ন পুলিশ প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের কাছে দিকনির্দেশনা পাঠিয়েছে সদর দপ্তর। বখাটেদের কঠোরভাবে দমনের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা পেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়া দুর্বৃত্তরা ভয়ংকর হয়ে উঠছে। কতিপয় রাজনৈতিক নেতার কারণে সমাজে খুন, ধর্ষণ, অপহরণের মতো অপরাধ বেড়েছে। বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস সব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক যোগসাজশ পাওয়া যাচ্ছে। অতীতেও এমন পরিস্থিতি ছিল। মাঝে কিছুটা শান্ত ছিল পরিস্থিতি। এখন আবার নির্যাতিতরা বিচারবঞ্চিত হচ্ছে। সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালন করতে পারছে না পুলিশ। সামাজিক এসব অপরাধ ঠেকাতে সামাজিক আন্দোলন নেই বললেই চলে। তবে অপরাধী যারাই হোক, তাদের শাস্তির আওতায়

না আনলে এসব ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হয়নি। কিছু ঘটনা ঘটেছে সেগুলো উত্তরণের চেষ্টা করছি। বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যাকা-ের ঘটনায় আমরা বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। মূল আসামিসহ অন্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, সামাজিক অপরাধগুলো প্রতিরোধ করতে কাজ করছে পুলিশ। এজন্য পুলিশের পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। যারা অপরাধ করবে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। একই কথা বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, অপরাধীদের কোনো ছাড় নেই। যারা অপরাধ করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। সামাজিক অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে পুুলিশের পাশাপাশি রাজনীতিবিদ ও সমাজের গণ্যমান্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, নারী-শিশু নির্যাতন, ধর্ষণসহ নানা সামাজিক অপরাধ আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে। অতীতের তুলনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অনেক শক্তিশালী করা হয়েছে। তারপরও এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়া দুঃখজনক। এসব অপরাধ দমনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক তাকে অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে। সেটি করতে না পারলে এসব অস্থিরতা চলতেই থাকবে। যে অপরাধ করবে তাকে শাস্তি দিতেই হবে। অপরাধ করে পার পাওয়া যাবেÑ এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় বেড়ে গেছে। বখাটেদের উৎপাত সহ্যের সীমা ছাড়াচ্ছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে ফেইসবুকসহ সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীসহ অনেকেই এ ধরনের অপরাধে ঝুঁকছে। সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতিও চালু আছে। এ কারণে অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বাড়ছে। চলতি বছর পাঁচ মাসে ৭৯০ জন নারী-শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৬ ভাগ নারী কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। উন্নত অথবা অনুন্নত যে দেশই হোক না কেন, চিত্র মোটামুটি একই।

বাংলাদেশে মামলার সংখ্যা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গেল বছর দিনে গড়ে ৫৭০টির বেশি মামলা হয়। এ সময় সারা দেশে ২ লাখ ৮ হাজার ২৬০টি মামলা হয়েছে, যা ২০১৭ সালে ছিল ২ লাখ ২১ হাজার ৫২৯টি। আর গত পাঁচ মাসে সারা দেশে এক লাখের বেশি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাই বেশি। গত বছর দেশে হত্যা মামলা হয় ৩ হাজার ৫৮৩টি, যা দৈনিক হিসাবে প্রায় ১০টি। পুলিশ সদর দপ্তরের আরেকটি পরিসংখানে দেখা যায়, ২০০৯ সালে সারা দেশে হত্যামামলা হয় ২ হাজার ৯৫৮টি, ২০১০ সালে ৪ হাজার ১৭টি, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৯৮৮টি, ২০১২ সালে ৩ হাজার ৯৯৭টি, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৫৮৮টি, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ৩৫টি, ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৫৯১টি, ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৫৪৯টি এবং ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮৩০টি। আর গত পাঁচ মাসে হয়েছে ৯১২টি হত্যামামলা।

বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রতিদিন গড়ে ১৩ শিশু নির্যাতন, দুই শিশু ধর্ষণ এবং এক শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণ বাড়ে অন্তত ৩৪ শতাংশ। এর বাইরেও বহু অপরাধের ঘটনা নিত্যদিনই ঘটে। সেসব ঘটনা রেকর্ড হয় না থানায়। গত বছর ৮৭ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গণপরিবহনেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৩ শতাংশ। কর্মজীবী ও গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। শিশুদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ২৯৮ শিশু আত্মহত্যা করে, ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ২১৩। চলতি বছর পাঁচ মাসে এসব ঘটনা তুলনামূলক আরও বেড়ে গেছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ফেনীর কলেজছাত্রী নুসরাত, ঢাকার মুগদার গৃহবধূ হাসিকে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় দিনদুপুরে ছুরিকাঘাতে শারমিন আক্তার লিজা নামে এক কলেজছাত্রীকে হত্যা করা হয়। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে রোজিনা বেগম নামে এক গৃহবধূর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তার স্বামী আবদুল্লাহ। ঠাকুরগাঁও সদরে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় ভাতিজার ছুরিকাঘাতে আহত তরুণী তানজিনা আক্তার সম্প্রতি মারা গেছেন। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন মুকুল ও তার মা রাজিয়া খাতুনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নরসিংদীতে কেরোসিন ঢেলে ফুলন রানী বর্মণ নামে এক নারীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বরগুনার মতো সিলেটেও এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। আমরা দেখেছি, এ দুটি ঘটনায় একটি মানুষও এগিয়ে আসেনি। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবং গণতন্ত্র সংকুচিত হওয়ায় মানুষ নৈতিক প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। তিনি বলেন, সমাজে দুর্বৃত্তরা অনেক অপরাধ করে, সেটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এটির মাত্রা বা প্রকাশ্য দিবালোকে যখন প্রতিবাদহীনতা থাকে এবং প্রতিরোধ হয় না তা ভয়াবহ। আমাদের দেশে রাজনীতিও এখন দুর্বৃত্তদের দখলে। এসব আনুকূল্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, অপরাধীরা মনে করছে, অপরাধ করেই পার পাওয়া যায়। অনেকে অপরাধের শিকার হলেও প্রতিবাদ করতে পারে না। এছাড়া সাইবার প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ ও এর অপব্যবহারে কারও কারও মধ্যে বিকৃত মানসিকতা দেখা দিচ্ছে। এসব কারণে হঠাৎ অপরাধ বেড়ে গেছে। তবে রাজনৈতিক অপরাধ এখন কম। হঠাৎ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় আমরাও উদ্বিগ্ন। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হঠাৎ অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার পেছনে একটি চক্র কাজ করছে। তবে এখন রাজনৈতিক অপরাধ অনেক কম। কিন্তু সামাজিক অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসব প্রতিরোধ করতে গত বৃহস্পতিবার রাতেই সব রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপার এবং বিভিন্ন ইউনিটপ্রধানদের নানান দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়। আশা করি অল্প কিছুদিনের মধ্যে অপরাধের ঘটনা কমে আসবে।