পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের জায়গায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার জাদুঘর, মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স, সিনেপ্লেক্স, রেস্টুরেন্ট, শিশুপার্ক, স্কুল, মসজিদ, ল্যান্ডস্কেপিং, জলাধারসহ বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ‘পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপার্শ্বিক এলাকার উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প কাজের
উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করছে কারা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নির্মাণকাজ করছে রূপায়ণ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের কারাবাস, জাতীয় চার নেতাকে হত্যার স্মৃতি বর্তমান প্রজন্মের সামনে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করতেই এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘এই কারাগারের অনেক ইতিহাস রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতি রক্ষার্থেই আমাদের এই প্রয়াস। বঙ্গবন্ধু তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই এখানে কাটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এবং চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল যে সেলগুলোতে তা রক্ষিত রেখে আমরা জাদুঘরটি তৈরি করব সেটাই আমাদের প্রয়াস।’
তিনি জানান, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও ইতিহাস ফুটিয়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় সেখানে স্থানীয়দের জন্য একটি বিনোদন কমপ্লেক্স তৈরি করা হচ্ছে। থাকবে শপিং কমপ্লেক্সও। ২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় ৯৫টি স্থাপনা অপসারণ করা হবে। ৩৬টি স্থাপনা সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হবে। নতুন কিছু স্থাপনা নির্মাণ করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতেই কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ও অনুশাসনের আলোকে পুরান ঢাকাবাসীর বিনোদনে একটি স্থান তৈরিতে নকশা নির্ধারণের জন্য একটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ওই প্রতিযোগিতায় ৯০টি আর্কিটেকচার প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রেশন করে এবং চূড়ান্তভাবে ৩৪টি প্রতিষ্ঠান ডিজাইন উপস্থাপন করে। জুরি বোর্ডের যাচাই শেষে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে ফর্ম.থ্রি আর্কিটেক্টস নামক প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন চূড়ান্ত অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইইসি (ইঞ্জিনিয়ারিং ইন চিফ) বিভাগের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রূপায়ণ গ্রুপ এই কাজের অংশীদার হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু এমপি, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম, সুরক্ষা বিভাগের সচিব শহিদুজ্জামান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইইসি মেজর জেনারেল ইবনে ফজল সাইফুজ্জামান, প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাকিল আহম্মেদ, রূপায়ণ গ্রুপের উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন (অব.) পি জে উল্লাহ প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত আইজি প্রিজন কর্নেল আবরার হোসেন।
প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাকিল আহম্মেদ জানান, প্রকল্পটির মাস্টার প্ল্যান মোট তিনটি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। উত্তর দিকের অংশ জোন ‘এ’, মাঝখানের অংশ জোন ‘সি’ এবং নিচের অংশ জোন ‘বি’। প্রকল্পের নতুন স্থাপনাগুলো জোন ‘এ’ এবং জোন ‘বি’তে তৈরি হবে। জোন ‘সি’র ১৩৪টি স্থাপনার মধ্যে ৩৬টি সংরক্ষণ করা হবে। বাকি বিল্ডিং ভেঙে অপসারণ করা হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও চার নেতার স্মৃতিসংবলিত জাদুঘর থাকবে। জোন ‘এ’তে মূল কাঠামো নির্মিত হবে। ৫.৬ একর জায়গায় থাকবে ছয়তলাবিশিষ্ট মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স। এছাড়া স্কুল, মসজিদ, ঐতিহ্যবাহী শপিংমল, অফিস ও ব্যাংক এলাকা, সুইমিংপুল ও জিমনেশিয়াম, সিনেপ্লেক্স, রেস্টুরেন্ট, ৪০০ গাড়ি পার্কিং ও ল্যান্ডস্কেপিং। জোন ‘বি’তে ৪.১ একর জায়গায় চক কমপ্লেক্সটি ঐতিহ্যবাহীভাবে আবার তৈরি করা হবে। আরও থাকবে বইয়ের দোকান ও খাদ্যসামগ্রী, শিশুপার্ক, মসজিদ, জলাধার, ৮৫টি গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান ও ল্যান্ডস্কেপিং। জোন ‘সি’তে ১৫.৩ একর জায়গায় থাকবে ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও সংস্কার, বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য ভবন পুনর্ব্যবহার ও ল্যান্ডস্কেপিং। ‘সি’তে যে জাদুঘর স্থাপন করা হবে সেই জাদুঘর হবে জীবন্ত, যেন ওখানে দর্শনার্থীরা গেলে তারা ওই মুহূর্তটা অনুভব করতে পারে। সুতরাং লাইফ ইফেক্ট ও সাউন্ড ইফেক্টের মাধ্যমে সেভাবে করার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটির ডিপিপি অনুমোদন হয় ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। সরকারি আদেশ জারি হয় ১৭ অক্টোবর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ১ নভেম্বর। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে জুলাই ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত।