এটিএম ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা কি প্রস্তুত?

একটি দক্ষ, নিরাপদ এবং অভিজ্ঞ আর্থিক কাঠামো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক। নিরাপদ আর্থিক কাঠামো মূলত আর্থিক লেনদেনের কার্যক্রমকে গতিশীল করে। আমাদের দেশে এটিএম-এর ব্যবহার আর নতুনের পর্যায়ে নেই। একদা বিদেশি ব্যাংকের হাত ধরে আগত এই মেশিন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শোভা পাচ্ছে। দেশের মানুষ ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছে সে সব মেশিন থেকে।

বাংলাদেশে এটিএম এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ই-ব্যাংকিং সার্ভিস। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে (২০১৯ মে) দেখা যায় (২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) মোট এটিএম-এর  সংখ্যা সরকারি ব্যাংকগুলোতে ২১০টি, বেসরকারি ব্যাংকে ৬,৪১৬টি, বিদেশি ব্যাংকে ১৪৪টি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৬টি এটিএম চালু আছে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এটিএম-এর  মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে। তবে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কিছু কমেছে। এখানে বলা যায় বিগত বছরের কিছু ঘটনা গ্রাহককে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন অনুৎসাহিত করেছে। ঠিক একইভাবে এটিএম-এর মাধ্যমে লেনদেন কমতে পারে। কেননা সাম্প্রতিককালে কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম থেকে টাকা চুরির ঘটনা গ্রাহক ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উভয়েরই কপালে ভাঁজ ফেলতে বাধ্য করছে। ১০ জুন, ২০১৯ প্রথম আলো থেকে জানা যায় এই জালিয়াতিতে ‘টুপকিন’ নামক ম্যালওয়ার ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বুথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এটিএম থেকে টাকা সরানো যায়; টাকা উত্তোলনের সময় ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারের যে নির্দেশনা আসার কথা সেটাও এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কার্ড স্কিমিং কার্ড চুরির একটি ধরন, যেখানে অপরাধীরা আপনার কার্ডের তথ্য চুরি করতে একটি ছোট ডিভাইস ব্যবহার করে। বর্তমানে আমাদের দেশে কার্ড স্কিমিং, কার্ড রিডার বসানোর মাধ্যমে এটিএম থেকে টাকা চুরির কাজে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে ক্যাশ মেশিনের সঙ্গে স্কিমিং যন্ত্র বসিয়ে কার্ড জালিয়াতি, পিন ও পাসওয়ার্ড জালিয়াতির অভিযোগ শোনা গেছে। এ ব্যবস্থায় এটিএম মেশিনের সঙ্গে ছোট্ট একটি যন্ত্র জুড়ে দেওয়া থাকে, যার মাধ্যমে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের সব তথ্য কপি হয়ে যায়, পরে যা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো অ্যাকাউন্টের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব।

একটা সময় অপরাধীরা কোনো ব্যক্তিকে কিডন্যাপ করে তার কাছ থেকে কার্ড ছিনতাই করে পাসওয়ার্ড নিয়ে টাকা হাতিয়ে নিত। তখন বলা হতো অপরাধীরা যাতে টাকা তুলতে না পারে সে জন্য কার্ডের গ্রাহক যেন তার সঠিক পাসওয়ার্ড না দেয়। ফলে অপরাধীরা দুই বা তার বেশিবার চেষ্টা যখন করত তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই কার্ড  লক হয়ে যেত। কিন্তু দিনে দিনে আইটি নিরাপত্তা যেমন বেড়েছে তেমনি অপরাধীরা তাদের অপরাধের ধরন বদলেছে। আমাদের দেশে এটিএম থেকে টাকা চুরি হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে, বিভিন্নভাবে এবং বিক্ষিপ্তভাবে। যার ফলে গ্রাহক ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এক ধরনের উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।

২০১০ সালে চারজন ব্যক্তি এটিএম স্কিমিংয়ের মাধ্যমে নিউইয়র্ক ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার চুরি করেছিল। ২০১১ সালে, এটিএম স্কিমিং ডিভাইসগুলোর ব্যবহার করে ওয়াশিংটন, ওরেগন, নেভাডা, অ্যারিজোনা এবং আইডাহোর ব্যাংকগুলো থেকে ৫ লাখ ডলার চুরি করা হয়। ২০১৬ সালে, ক্লোন কার্ড ব্যবহার করে অকল্যান্ডের ব্যাংকগুলো থেকে ১ লাখ ডলার চুরি করে নেওয়া হয়েছিল। ক্রেডিট কার্ড স্কিমিং ডিভাইসগুলো বিদ্যমান এটিএম বা ইন-স্টোর কার্ডের মতো দেখতে। যখন একটি ক্রেডিট কার্ড, এই ডিভাইসগুলোর মধ্যে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, তখন এটি কার্ডের চৌম্বকীয় স্ট্রিপটিতে সংরক্ষিত বিবরণগুলো ধরে নেয় বা কপি করে নেয়। এই তথ্য দিয়ে, তারা জাল, ক্লোন ক্রেডিট কার্ড বা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরি করতে পারে।

যেহেতু আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো এসব বিষয়ে দায়দায়িত্ব নিতে চায় না তাই গ্রাহককেই সতর্কতা নিয়েই এটিএম ব্যবহার করা উচিত। কার্ড স্কিমিং ঠেকানোর জন্য একজন গ্রাহক যখনই এটিএম-এ কোনো লেনদেন করবেন তাকে ভালোভাবে লক্ষ করতে হবে এটিএম-এ কি-প্যাডের ওপর বাম পাশে কোনো ছোট্ট যন্ত্র আছে কি না। অর্থাৎ অসামঞ্জস্য কিছু দেখলে গ্রাহককে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এটিএম ব্যবহার করার আগে, সর্বদা কোনো সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য দেখলেও সতর্ক থাকা দরকার।

আবার যেমন, আপনি যদি কেনো দোকান বা রেস্টুরেন্টে খেতে যান তবে আপনি আপনার কার্ডটি কারও হাতে না দিয়ে নিজেই নির্দিষ্ট ডিভাইসে পাঞ্চ করে টাকা পরিশোধ করলে ঝুঁকিমুক্ত হওয়া সম্ভব। একটি শপিংমলের ভেতর স্থাপিত এটিএম, রাস্তায় বাইরে স্থাপিত এটিএম থেকে নিরাপদ। ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট চেক করা যেতে পারে। ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করা একটি ভালো অভ্যাস। এটি করা অত্যাবশ্যক কারণ আপনি এ থেকে প্রতারণামূলক লেনদেনগুলো অবিলম্বে শনাক্ত করতে পারেন এবং আরে চুরি প্রতিরোধ করতে আপনার অ্যাকাউন্টটি হিমায়িত করা যেতে পারে। সন্দেহজনক কার্যকলাপ রিপোর্টের ক্ষেত্রে অবিলম্বে আপনার ব্যাংককে, এটিএম সরবরাহকারী (যেখানে প্রযোজ্য) এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কল করা যেতে পারে। যখন আপনি বিদেশে যাবেন তখন আপনার ব্যাংককে অবহিত করতে হবে। আপনি কোথায় যাচ্ছেন তা আপনার ব্যাংককে জানতে দিন, কারণ এটি আপনাকে বিদেশে থাকাকালে বৈধ লেনদেন শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।

জ্যাকপট ম্যালওয়ার দিয়ে চুরি করলে যেহেতু কোনো গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নম্বর ব্যবহার করতে হয় না সেহেতু, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। যে কারণে এখানে একজন ব্যক্তির চেয়ে ব্যাংকের সচেতন হওয়ার প্রয়োজন বেশি। যদি ‘টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ মানে পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর মোবাইলে আরেকটি কোড নম্বর প্রদানের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করা যেতে পারে। সেটি ব্যবহার করে গ্রাহক টাকা তুলতে পারবেন, এমন ব্যবস্থা চালু করা যায়।

পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে এই মর্মে বাংলাদেশকে সতর্ক করা হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় আমরা আগে থেকে পদক্ষেপ নিইনি কেন? সামনে আরও যে ঝুঁকি আসবে বা আসছে তার জন্য কি আমরা প্রস্তুত?

লেখক : ব্যাংকার, গবেষক ও

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খ-কালীন শিক্ষক