তুরাগসহ দেশের সব নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা, আইনি ব্যক্তি ও আইনি সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। নদ-নদীকে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ ঘোষণা করে নদী দখলকারীদের সব ধরনের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি নদী দখলকারীরা যাতে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ না পায় সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে আদালত। নদী দখল-দূষণ রোধে বারবার আদালতের দারস্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রায়ে বলে, নদী নিয়ে এই কানামাছি খেলা বন্ধ হওয়া উচিত।
তুরাগ নদ রক্ষায় রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত ৩০ জানুয়ারি ও ৩ ফেব্রুয়ারি রায় দেয় বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২৮৩ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। এতে একমত পোষণ করেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
রায়ে বলা হয়েছেÑ পরিবেশ, জলবায়ু, জলাভূমি, সমুদ্র, সমুদ্রসৈকত, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নালা, ঝিরি, সব উন্মুক্ত জলাভূমি, পাহাড়-পর্বত, বণ্য প্রাণী এবং বাতাস, পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি তথা জাতীয় ও জনগণের সম্পত্তি। তাই এই সম্পত্তি দখলকারী এবং দূষণকারী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দেশের সব ধরনের নির্বাচনে অযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্বাচন কমিশনকে হলফনামার মাধ্যমে অবহিতকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এসব সম্পত্তি দখলকারী ব্যক্তি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যাতে ঋণ না পায় সেজন্য সব তফসিলি ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে সার্কুলার জারি করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্ট বলেছে, ‘নদী বাঁচা-মরার ওপর বাংলাদেশের অস্তিত্ব জড়িত। বাঁচলে নদী বাঁচবে দেশ, বাঁচবে প্রিয় বাংলাদেশ।’ রায়ে আদালত বলেছে, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের পুরোটাই পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীকে হত্যা করা প্রকারান্তরে আমাদের সবার সম্মিলিত আত্মহত্যার নামান্তর। নদীকে হত্যা করার অর্থ হলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হত্যা করা।’ হাইকোর্ট রায়ে আরও বলেছে, ‘নদী দূষণ ও দখলকারীরা দেশ, স্বাধীনতা ও মানবতার শত্রু। তারা মানবজাতি ও সভ্যতার হত্যাকারী।’ আদালত বলেছে, ‘নদীগুলো চলুক নিরবধি। জোয়ার-ভাটায় তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখতে থাকুক। মৎস্যজীবীর মুখে আবার হাসি ফিরে আসুক।’
পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট নদী রক্ষায় বেশ কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেয়।
রাষ্ট্র দেশের সব নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রসৈকত, বন, খাল-বিল, জলাধারের মালিক হিসেবে ট্রাস্টির মতো দায়িত্ব পালন করবে বলে আদালতের রায়ের মৌলিক সিদ্ধান্তে বলা হয়। পাশাপাশি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদ-নদীর অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া রায়ের দিন থেকে সব নদ-নদী ও খাল-বিল রক্ষায় জাতীয় নদী কমিশন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আদালতের রায়ে বলা হয়।
আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়, নদ-নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে এর ভিত্তিতে কঠিন সাজা, জরিমানা নির্ধারণ, অভিযোগ দায়ের পদ্ধতি ইত্যাদি সংক্রান্ত নদী কমিশনের প্রস্তাব বর্তমান কমিশনের আইন সংশোধন করে ৬ মাসের মধ্যে আদালতে হলফনামা দাখিল করতে হবে।
এ ছাড়া ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্পারসো স্যাটেলাইটের সাহায্যে আরএস/জিআইএস উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সব নদ-নদীর ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করে সব জেলা, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়নের জন্য উন্মুক্ত করে রাখা যাতে যেকোনো নাগরিক নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নদ-নদীর তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন সে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় আদালতের রায়ে। এ ছাড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে কার্যকর ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয় হাইকোর্টের রায়ে।
রায়ে নদী রক্ষায় প্রতিরোধমূলক নির্দেশনায় বলা হয়, দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিতে প্রতি দুই মাসে এক ঘণ্টার জন্য নদ-নদীর প্রয়োজনীয়তা ও দূষণ সম্পর্কে পাঠদান করতে হবে এবং এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদারকি করবে। এ ছাড়া নদী বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমে নদ-নদী সংরক্ষণ এবং দূষণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ছোট-বড় সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের অংশগ্রহণে দুই মাসে অন্তত এক ঘণ্টার জন্য নদীসংশ্লিষ্ঠ বৈঠক করতে হবে এবং বিষয়টি তদারকি করবে শিল্প মন্ত্রণালয়। সব জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে তিন মাসে অন্তত একটি করে সেমিনার আয়োজন করে নদীর ওপর আলোচনা করতে হবে। প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদের স্ব স্ব অধিক্ষেত্রে নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে তা পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে।
টঙ্গীতে তুরাগ তীরে মাটি ভরাট ও অবৈধ দখলের প্রতিবেদন একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করে। সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করা হয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। বিআইডব্লিউটির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ মফিজুর রহমান, রাজউকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইমাম হাসান। এ ছাড়া বিবাদীপক্ষে আইনজীবী আসাদুজ্জামান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাকিব বিন মাহবুব শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একরামুল হক টুটুল।