মেসির আরেকটি পতনের ম্যাচে আলভেজের ‘পুনর্জন্ম’

আকাশি-সাদা জার্সি পরে যে লোকটা সবার আগে মাঠ ছাড়লেন তিনি সঙ্গে নিয়ে গেলেন পরিচিত বিরহ। ‘নাম্বার টেন’ ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বিকেলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে শুধু ০-২ গোলে হারলেন না, নিজের মহিমাকে নামিয়ে আনলেন আরেকটু নিচে। আর তার চেয়ে বছর চারেকের বড় দানি আলভেজ যে ম্যাচটা শেষ করে কোপা আমেরিকার ফাইনালে পা রাখলেন, তা যেন তার পুনর্জন্ম!

বয়সের মাপকাঠিতে লিওনেল মেসি আর আর ওই আলভেজ দুই দলের মধ্যে বর্ষীয়ান। ৩২ বছরের মেসি আগের সেই গতি আর ড্রিবলিং ত্যাগ করেছেন অনেক আগে। তবু যা আছে তা দিয়ে ক্লাব পর্যায়ে প্রায়ই বাজিমাত করেন। কিন্তু বেলো হরিজন্তেতে সেটি পারলেন না। বার তিনেক খুব কাছে গিয়েও ফিরে এসেছেন। আর ওই আলভেজ? ‘শেষ বয়সে’ এমন একটি ম্যাচ খেলে বেরিয়েছেন যেটি তার শুরুর সময়কে হার মানিয়েছে।

ব্রাজিল এবার কোপা আমেরিকা জিতবে কি না, সেটি পরের কথা। কিন্তু আলভেজ এরই মধ্যে একটি খেতাব আরও অবিসংবাদী করে ফেলেছেন। পেলের দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা রাইটব্যাক তাকে আগেই বলা হতো, কিন্তু এবার সেটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন।

প্রথমার্ধে ৬২ বার বলে গেছেন। পাস দিতে দেখা গেছে ৪৫টি। দ্বিতীয়ার্ধে ছিলেন আরও দুর্দান্ত। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গোটা ম্যাচে ১১১ বার বলের সঙ্গে মিতালি করেছেন। পাস দিয়েছেন ৭৮টি!

কোচ তিতে এদিন ব্রাজিলকে ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলান। এই ফর্মেশনের সবচেয়ে বড় অসুবিধা পাসিংয়ে। ডিফেন্স বল ক্লিয়ার করার পর নিজের খেলোয়াড়কে ভালো পজিশনে বল দিতে না পারলে দারুণ ঝামেলা হয়ে যায়। সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড এলোমেলো হয়ে যায়। এসব সামলাতে, বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ড পজিশনকে সমর্থন জোগাতে শুধু শক্তি থাকলেই হয় না, খেলাটা হৃদয় দিয়ে বুঝতে হয়। আলভেজ শুধু হৃদয় দিয়ে নয়, মেধা দিয়েও বুঝেছেন।

২০১১ সালের পর এই আলভেজকে খুব কম দেখা গেছে। আগুয়েরোর পাশে খেলা মার্টিনেজকে তিনি জায়গাই দেননি। মার্কোস অ্যাকুনাকে একবার এরিয়াল বলে দারুণ দক্ষতায় পরাজিত করেন। সেন্টার মিডফিল্ডার লিয়েনড্রো প্যারেডেসও বারবার তার কাছে বোকা বনেছেন।

আর্জেন্টিনার ডিফেন্স এদিনও সেই তলাবিহীন ঝুড়ি। ‘একটা ওটামেন্ডি থাকলে ম্যাচ হারতে আর কিছু লাগে না’ কোপা আমেরিকায় এই বাক্য এখন খনার বচনে পরিণত হয়েছে।

প্রথম গোলে ডিফেন্স যেভাবে ‘ডজ’ খেয়েছে, তারপর গোলরক্ষকের খুব বেশি কিছু করার ছিল না। এটি ফুটবলে পরিচিত বিষয়। সরাসরি গোল হলে সেটি এক ব্যাপার; কিন্তু ডিফেন্স ‘বিট’ হয়ে গেলে গোলরক্ষক সেই গোল আর ঠেকাতে পারেন না। এতে তার পজিশন যেমন ভেঙে যায়, তেমনি নষ্ট হয়ে যায় লক্ষ্য।

প্রথম গোলে আলভেজ তিনজনকে বিট করেন। সেটি করার পথে ফিরমিনহোর জন্য জায়গা বানান। তাকে ‘স্পেস’ দিয়ে বল ছাড়েন। ফিরমিনহো বাকি কাজটুকু সারেন জেসাসের সঙ্গে। চোখের ইশারায়।

আর্জেন্টিনার জন্য আলভেজের ডানদিক খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই দিক থেকেই দলটি সাধারণত বেশি আক্রমণ গড়ে। গত কয়েক ম্যাচে প্রায় ৪৩ শতাংশ আক্রমণ করেছে তারা ডান উইং ব্যবহার করে। এদিন আলভেজের প্রতিরোধের মুখে দিক পরিবর্তন করেও ফায়দা লুটতে পারেননি মেসিরা। আলভেজ লেফট উইংয়েও হানা দিয়েছেন!

অন্যদিকে ব্রাজিল ম্যাচটা বের করেছে আলভেজের রাইট উইং দিয়ে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়েছেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে খেলা জেসাস। আর একমাত্র স্ট্রাইকার ফিরমিনহো।

১৯তম মিনিটে ফিরমিনহোর পাস থেকে গোল করেন জেসাস। আর ৭১তম মিনিটে জেসাসের পাস থেকে গোল করেন ওই ফিরমিনহো। ঠিক যেন প্রতিদান!

আলভেজের পর কারো কথা বলতে গেলে আলোচনায় আসবেন জেসাস। মাঝমাঠকে তিনিই নিয়ন্ত্রণে রাখেন। ৫১বার বল ধরেছেন। ফাউল জিতেছেন চারটি। দুটি ভালো সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। এরিয়াল বলেও দক্ষতা দেখিয়েছেন, দুইবার প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে বিট করেছেন।

মেসিকে মাঝমাঠে আটকে রাখার বেশি কৃতিত্ব ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরোর। ট্যাকল করেছেন, ফাউলও হয়েছে কিন্তু হলুদকার্ড দেখেননি।

এসবের ভিড়ে মেসি ওইভাবে খুব একটা পরিষ্কার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেননি। পারেননি দুই স্ট্রাইকার আগুয়েরো, মার্টিনেজকে দিয়ে খেলাতে। শুধু ব্যতিক্রম ছিল তার ওই ফ্রি-কিক। কিন্তু সেটিও প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক সরাসরি গ্রিপে নিয়ে নেন।

বাকি সুযোগগুলোর বিষয়ে কেউ ভাগ্যের প্রসঙ্গ টানলে টানতে পারেন। সঙ্গে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে এই আর্জেন্টিনা আলভেজদের কৌশল আর সামর্থ্যের কাছে নতজানু হয়েছে!