কোনো রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ করেই খোলাবাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে চাপের মধ্যে পড়েছে ঢাকা মহানগর ও আশপাশের ২৪ হাজার পরিবারের নিম্ন আয়ের মানুষ। ঢাকা মহানগর ও চারপাশের শ্রমঘন এলাকার স্বল্প আয়ের লোকজন ওএমএস কেন্দ্র থেকে ফিরছেন খালি হাতে। খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ডিজি ও এক কর্মকর্তার ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটি হয়েছে। শিগগিরই তা আবার চালু হবে।
সূত্র জানিয়েছে, চাল ও আটার মূল্য স্থিতিশীল রাখাসহ নিম্ন আয়ের লোকদের কাছে এ দুটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহজলভ্য রাখতে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। প্রতি বছরই এই কর্মসূচি হালনাগাদ করে খাদ্য অধিদপ্তর। নতুন অর্থবছরেও এ কর্মসূচি ঢাকা ও চারপাশের শ্রমঘন এলাকায় চালু রাখার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অনুরোধ জানিয়েছিলেন ঢাকা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। মহাপরিচালকের কাছে এ সংক্রান্ত ফাইলও উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের তদারকি সংস্থার সুপারিশ উপেক্ষা করে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ওএমএস বন্ধ করে দেন।
এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা ভুল বোঝাবুঝি। সংশ্লিষ্ট সেকশন থেকে ওএমএস বহাল রাখার জন্য ফাইল তোলা হলেও তা বহাল রাখা সম্ভব হয়নি। মাঝের কয়েকটা দিন ওএমএস বন্ধ হলেও শিগগিরই তা চালু হবে।’
ঢাকা মহানগর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের শ্রমঘন এলাকাগুলোতে প্রচুর দরিদ্র শ্রেণির লোকজন এবং গার্মেন্টকর্মী বাস করেন। বর্তমানে আটার বাজার দর কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ভোক্তাপর্যায়ে আটার চাহিদা বেড়েছে। খাদ্য পরিকল্পনা পরিধারণ ইউনিটের দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতির গত রবিবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতি কেজি আটা ২৬ থেকে ৩০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে এই আটা ২৫ থেকে ২৮ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
বর্তমানে সরকারের গুদামভর্তি গম। এসব গম বিতরণ করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ওএমএস, ইপি (এসেনশিয়াল প্রায়োরিটি) এবং ওপি (আদার্স প্রায়োরিটি) খাত। এসব খাত ছাড়া গম বিতরণের অন্য কোনো কর্মসূচি নেই। বর্তমানে সরকারি গুদামে মজুদকৃত গম দীর্ঘদিন বিতরণ করা না হলে মানের অবনতি ঘটবে। তাই গম ও আটার বাজার স্থিতিশীল রাখা ও সরকারি গুদামে মজুদ পুরনো গম সরবরাহের জন্য ঢাকা মহানগরসহ অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরে ওএমএস কার্যক্রম চালু রাখা প্রয়োজন বলে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন।
ঢাকা মহানগর, তেজগাঁও সার্কেল, কেরানীগঞ্জ ও সাভারে ওএমএসের ১২০টি কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ২৪ হাজার পরিবার আটা কিনে থাকে। প্রতি কেন্দ্রে বা প্রতি ট্রাকে গড়ে এক টন করে আটা বিক্রি করা হয়। একজন ক্রেতা পাঁচ কেজি করে আটা কিনতে পারেন। সেই হিসাবে একটি কেন্দ্র থেকে ২০০ জন আটা কিনতে পারেন।
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে ওএমএসের আরও ৩৮৬টি কেন্দ্র রয়েছে। তবে বর্তমানে বোরো সংগ্রহ অভিযান চলার কারণে এসব কেন্দ্র থেকে আটা বিক্রি করা হয় না। ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে ট্রাকে করে আটা বিক্রি করলেও ঢাকার বাইরে ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে এজেন্ট নিয়োগ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন রাজধানীর পান্থপথ কেন্দ্র থেকে শুক্রাবাদ ও রাজাবাজারের নিম্নআয়ের বাসিন্দারা ওএমএসের আটা সংগ্রহ করেন। কিন্তু ৩০ জুন রবিবারের পর সেখানে আটা ও চাল নিয়ে কোনো ট্রাক পৌঁছায়নি। কোনো নোটিসও দেওয়া হয়নি। গতকাল বুধবার পান্থপথ কেন্দ্রে ওএমএসের আটার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব হারেসা বিবি। কিন্তু দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তিনি ওএমএসের ট্রাকের দেখা পাননি। আগের দিন মঙ্গলবারও তিনি সেখানে দিনভর অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু কোনো ট্রাক যায়নি। হারেসা বিবি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওএমএসের চাল আর আটা দিয়েই চলি। দোকানে প্রতি কেজি আটার দাম ৩৫ টাকা। আর ওএমএসের ট্রাকে প্রতি কেজি আটা বিক্রি করা হয় মাত্র ১৮ টাকায়। আর চাল বিক্রি হয় ৩০ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে চাল বিক্রিও বন্ধ আছে। চাল বিক্রি না হলেও কোনো সমস্যা নাই। কারণ বাজারেও চালের দাম কম। কিন্তু আটা বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলেই বিপদ। ওএমএসের আটার ওপরই বাইচা আছি।’ আজিমপুরের কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরেও একই চিত্র পাওয়া গেছে।
বর্তমানে জেলা শহর ও বিভাগীয় শহরের আশপাশে বোরো ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। এ কারণে ধান-চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। ঢাকা মহানগর ও গাজীপুরে বোরো ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম নেই। এ পরিস্থিতিতে আটা ও চালের বাজারদর স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে ঢাকা মহানগর, গাজীপুর ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় ওএমএস খাতে আটা ও চাল বিক্রি প্রয়োজন বলে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন।