হুকুমজারি হয়েছে, ঢাকার আরও তিনটি সড়কে রিকশা চলতে পারবে না। কে বা কারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা পত্রিকায় সবাই দেখেছে। কারা কারা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল না? বলা চলে তারা, যাদের দৈনন্দিন জীবন রিকশার মতো এসব পরিবহনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো নিয়ে কোনো গণশুনানির অপেক্ষা না করে, তাদের বাস্তবতাগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহীতারা আদৌ সচেতন কি না, তার বিন্দুমাত্র আভাস না দিয়ে এবং সবচেয়ে বড় কথা, যানবাহনের প্রয়োজনীয়তার কোনো সমীক্ষা সম্পন্ন না করে এবং তাদের জন্য কী কী বিকল্প বন্দোবস্ত করা হচ্ছে, তার ঘোষণা না দিয়েই রিকশা উচ্ছেদের ঘোষণা চলে এসেছে।
রিকশা বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কতগুলো বিষয়ে কর্র্তৃপক্ষ সচেতন কি না, তা বোঝা দরকার। সংক্ষেপে কয়েকটি প্রশ্ন এখানে আলোচনা করা গেল।
১. মোট কত মানুষ রাস্তাগুলো ব্যবহার করছে, তার পরিসংখ্যান হাজির করুন। তাদের মধ্যে কতভাগ রিকশা ব্যবহার করছে, তা জানান। কতভাগ অন্যান্য বাহন, যেমন বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ইত্যাদি বাহন ব্যবহার করে, সেটাও নির্ধারণ করা দরকার। এরপর প্রয়োজনে রিকশায় যত ভাগে যাত্রী চড়ে, তাদের জন্য বিকল্প হিসেবে কত বাহন প্রয়োজন, বিশেষ করে গণপরিবহন। তাদের জন্য এই বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা করে তারপর রিকশা বিষয়ে আলাপ শুরু হোক। উচ্ছেদ সোজা, কিন্তু যে মা তার সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে রিকশার ওপর ভরসা করেন, যে চাকরিজীবীরা রিকশার ওপর নির্ভরশীল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার ভয়ে যারা রিকশাকে ব্যবহার করেন, তাদের কী বিকল্প বন্দোবস্ত করলেন, সেটা কে ভাববে? শুধু বলে দিলেন, ভবিষ্যতে দেখব?
২. রিকশা অনিরাপদ। সত্যি। কিন্তু এর কারণ হলো রিকশা বিষয়ে আমাদের প্রকৌশলবিদ্যা কোনো ভূমিকা রাখেনি কোনো দিন। এই দিক দিয়ে বলা যায়, আমাদের প্রকৌশলীরা হয়তো নাসাতে মঙ্গল অভিযানের যন্ত্রকৌশলে ভূমিকা রাখছেন, কিন্তু দেশের প্রযুক্তি সমস্যা দূর করায় তাদের মর্যাদাবোধে হানি হয়।
রিকশা ধীর গতির। এটাও সত্যি। কিন্তু মিথ্যাও। রিকশার গতি খানিকটা স্থানীয় কারিগররাই বৃদ্ধি করেছেন সহজ কিছু প্রযুক্তি দিয়ে। এখন আপনি যদি রিকশা রাস্তাজুড়ে কতখানি জায়গা নেয় এবং তার গড় গতি কত, তা দিয়ে একটা হিসাব কষেন, তাহলে ঢাকা শহরের অধিকাংশ বাহনের তুলনায় রিকশাকে বেশি গতিশীল মনে হবে। এ ছাড়া সম্ভব রিকশার আধুনিকায়ন, চাকার আকৃতি ছোট করে যেন উলটে না যায়, যেন পা ছড়িয়ে বসা যায়, তেমন প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়ে রিকশার নবায়ন। প্রয়োজন এর ব্রেকের আধুনিকায়ন। ঝাঁকুনি সহ্য করার ক্ষমতার বৃদ্ধি। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রিকশাচালকের প্রশিক্ষণ, অনুমোদনের কাগজ প্রদান।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় হিসাব করলে তো সবচেয়ে কম জ্বালানি খরচে সবচেয়ে কার্যকর বাহন বিদ্যুৎচালিত রিকশা, যার গতি সীমিত, যার চালকরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং অনুমোদিত, যারা অবশ্যই প্রশিক্ষণের গুণে নির্দিষ্ট রাস্তা ধরে একটার পেছনে আরেকটা যাবেÑ ঢাকার মতো নগরে রিকশাই সবচেয়ে উপযুক্ত বাহন হতে পারে। ফলে অনুমোদনহীন বাহন বলে রিকশা উচ্ছেদ না করে প্রয়োজনীয়সংখ্যক রিকশাকে অনুমোদন দেওয়াই বিবেচকের কাজ হওয়ার কথা।
৩. নিউ মার্কেট থেকে সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত আলাদা করে দেওয়া রিকশার রাস্তাটার কথা ভাবুন, কতটা কার্যকরভাবে একটার পেছনে আরেকটা রিকশা ধানমন্ডি, রায়েরবাজার, জিগাতলার বিপুল এলাকার মানুষকে সেবা দিচ্ছে। ঝটপট উচ্ছেদের কথা না ভেবে এমন বিকল্পের কথা ভাবাটা জরুরি। যে রাস্তাগুলোতে রিকশা উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর সবগুলোতেই এ ব্যবস্থাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। রিকশা নেই, এমন বহু রাস্তাতেও ভয়াবহ যানজট, এর কারণ তো রিকশা না, ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য। এমনকি বনানীর মতো উড়ালসেতুর ওপরও যে ভয়াবহ যানজট আমরা দেখি, তার কারণ কোনোভাবেই রিকশা নয়।
৪. ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর বিপুল কর বসিয়ে তাকে নিরুৎসাহিত করা এবং গণপরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়া কোনো উচ্ছেদ, কোনো মেট্রোরেল বা অন্য কোনো কিছুই ঢাকার পরিবহন সংকট সমাধান করবে না। মেট্রোরেল উত্তরা থেকে লাখ লাখ মানুষকে ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার মাঝখানে এনে ফেলবে। তারপর তাদের তো নানা বাহন ব্যবহারই করতে হবে। ফলে ঢাকাতে যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। স্মরণ রাখা উচিত, ভয়াবহ প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ঢাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ আসলে প্রয়োজন ছাড়া রাস্তাতেই নামেন না। কাজ থেকে ফিরে বাড়িতে আটকা থাকেন। আত্মীয়তা, সামাজিকতা, বিনোদন, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদি নাই হয়ে যাচ্ছে যানজটর কারণে, এমন যে আক্ষেপ দেখি, তাও মিথ্যা না, তার অর্থনৈতিক মূল্যও বিশাল। সাধারণ মানুষ একটা আধুনিক শহরে যত কিলোমিটার প্রতিদিন ভ্রমণ করেন, সেই তুলনায় ঢাকার চাহিদা মেটাতে বহু, বহু গুণ বেশি গণপরিবহন প্রয়োজন। গণপরিবহন, গণপরিবহন এবং গণপরিবহনই ঢাকার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান। রিকশা উচ্ছেদের যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই গণপরিবহনের কার্যকর উন্নতি দৃশ্যমান করতে হবে।
৫. নগরের একটা মর্মান্তিক দিক হলো শুধু নিজেদের প্রয়োজন নিয়েই ভাবে সে। যুক্তি হলো, যাকে উচ্ছেদ করা হবে, তার জীবিকা ঠিক রাখার দায়িত্ব নগরের না। এটা রাষ্ট্রের দায়। বাংলাদেশে প্রতিদিন কর্মসংস্থান কমছে। গত ছয় বছরে দেশে কারখানার সংখ্যা কমেছে। ফলে এ বিষয়ে সরকারের ভাবনা কী, সেটা নগর কর্তৃপক্ষ না ভাবুক, সরকারকে তো তা ভাবতে হবে। কেননা যেভাবেই হোক, দেশটা চালানোর দায়িত্ব তো তারা পেয়েছে।
শহর ও গ্রামাঞ্চলে পরিবহন কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎস। আরও বড় একটি উৎসে পরিণত হতে পারে এই পরিবহনগুলোকে স্বদেশে উৎপাদন। যত তুচ্ছ জীবিকাই মনে হোক না কেন, হোক যত প্রাচীন কিংবা স্থূল প্রযুক্তি, দেশীয় খাতে পরিবহন নির্মাণ দেশজুড়ে বড় একটি কর্মসংস্থানের উৎস। সেটাকে অবহেলা করা, তাকে স্বীকার করার একটা কার্পণ্য দেশের নীতিনির্ধারক মহলে উপস্থিত। অন্যদিকে, রিকশাকে যদি দূর ভবিষ্যতে তুলে দিতেই হয়, তার জন্য দরকার একটা ক্রমান্বয়িক পরিকল্পনা। সে ক্ষেত্রে বিকল্প পরিবহন কী কী হবে, কোন গতিতে তা করা হলে দেশীয় বিকল্প প্রযুক্তির বিকাশ, উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আমাদের সবার জন্য মঙ্গলের হবে, তা নিয়ে কখনো কোনো দিন কোনো নীতিনির্ধারককে কাজের কথা বলতে শোনা যায়নি।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, যা দিয়ে লেখাটার সূচনা, এই পুরো অঞ্চলটির জনগণের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনটাকে যে ধর্তব্যের মধ্যে নেননি নীতিনির্ধারকরা, সেটাই সবচেয়ে বড় আশঙ্কার। বস্তা-বাক্সপেটরা নিয়ে ২০০ টাকার নিচে নড়তে না চাওয়া সিএনজির শহরে বিপুল মানুষ কীভাবে সায়েদাবাদে পৌঁছাবে, কীভাবে মায়েরা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে নিয়ে যাবেন, কীভাবে আরও হাজার হাজার মানুষের সংকটের সমাধান হবে, সেটা ভাবা হয়নি। রাস্তা থেকে বহু মানুষকে তুলে দিতে পারলে যারা অবশিষ্ট থাকবেন, তাদের নিশ্চয়ই গতি বাড়বে। কিন্তু যাদের নিশ্চল করা হলো, যাদের গতি কেড়ে নেওয়া হলো, তাদেরও যে নাগরিক অধিকার আছে, তাদেরও বলার কথা আছে, সেটি শোনার লোকের অভাব থাকা এখন খুবই স্বাভাবিক।
লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলামনিস্ট