বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) আমানতের ৫১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তার স্ত্রী ও পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যকে আসামি করা হতে পারে বলে দুদক কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানকে আগামীকাল (৭ জুলাই) দুদকে তলব করা হয়েছে। এর আগেও কয়েক দফা তলব করা হলেও তিনি নানা অজুহাতে হাজির হননি।
দুদকের অনুসন্ধান দলের দলনেতা এবং সংস্থাটির উপপরিচালক এস এম সাহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে মেজর (অব.) মান্নান এবং তার পরিবারের সদস্যদের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি উঠে আসে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য তার কাছে কয়েক দফায় নোটিস পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি নানা অজুহাতে দুদকে হাজির হননি।
দুদক কর্মকর্তা সাহিদুর রহমান বলেন, ‘এবার তিনি হাজির না হলে দুদকের আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হবে। তাকে আর সুযোগ দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে অনুসন্ধান টিম তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন তৈরি করছে।’
বিআইএফসির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সাবেক চেয়ারম্যান মান্নান এবং তার পরিবারের সদস্যদের বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে ডুবতে বসেছে আর্থিক এই প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক বসিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও লাভজনক করতে পারছে না। এটি লোকসানি হিসেবেই আছে। মেজর (অব.) মান্নানের সানম্যান গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিআইএফসি। এর ৫০ শতাংশ মালিকানায় রয়েছে বিদেশি তিনটি কোম্পানি। এটি মূলত একটি লিজিং কোম্পানি। মান্নান ও তার পরিবারের সদস্যরা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আমানতের ৫৩৮ কোটি টাকার মধ্যে ৫১৮ কোটি টাকাই তুলে নিয়েছেন। যা উঠে আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে। পরে তাকে দফায় দফায় তাগিদ দেওয়া হলেও তিনি ওই অর্থ পরিশোধ করেননি।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, মান্নান, তার স্ত্রী এবং সাবেক চেয়ারম্যান উম্মে কুলসুম মান্নান, পরিচালক রইস উদ্দিন, রফিক উদ্দিন, মহিউদ্দিন, আকবর হোসেন, আবদুল ওহাব ও আয়েশা খানম তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৩৪ কোম্পানির নামে-বেনামে বিআইএফসি থেকে ৭০৩ কোটি টাকা বের করে নেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ধরা পড়ে। এর মধ্যে মান্নানের সানম্যানের ২৭ প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৭০ কোটি টাকা সরাসরি নেওয়া হয়। এ ছাড়া একই গ্রুপের সাত প্রতিষ্ঠানকে গ্যারান্টার দেখিয়ে নেওয়া হয় আরও ১৩৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বলা হয়, বিআইএফসির পরিচালক এ এন এম জাহাঙ্গীর আলম তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মটর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং রহমতউল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানির নামে ২৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। যা সুদ-আসলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি ৫২ লাখ টাকায়। এর মধ্যে রহমতউল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানির টাকা মেজর মান্নানের মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান সানম্যান ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
পরিচালক রোকেয়া ফেরদৌস তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠানের নামে ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। যার বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি ৬৩ লাখ টাকায়। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণও স্থানান্তর করা হয়েছে মেজর মান্নানের সানম্যান গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। এভাবে সর্বমোট তুলে নেওয়া হয়েছে ৫১৮ কোটি টাকা।
দুদকের অনুসন্ধান দলের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের নিজের নামে বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই বিআইএফসি থেকে ঋণ নেন মেজর মান্নান। খেলাপি হওয়ার পরও কিছু ঋণ খেলাপি হিসেবে না দেখানো, বিরূপ শ্রেণীকৃত ঋণকে নিয়মিত দেখানো এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনেক ঋণ হিসাবকে সিআইবিতে রিপোর্ট না করার ঘটনাও পরিদর্শনে উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল বিভিন্ন গ্রাহকের অগোচরে তাদের ঋণ হিসাবের বিপরীতে শ্যাডো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পরিচালকদের অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও খুঁজে পেয়েছে। লোকসানি এ প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের মালিকানা মূল উদ্যোক্তা হিসেবে মান্নান এবং তার পরিবারের সদস্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে। অন্যদিকে ৫০ শতাংশের মালিকানা ৩টি বিদেশি কোম্পানির কাছে আছে। ব্যাপক অনিয়ম করায় মান্নান, তার স্ত্রী এবং বিআইএফসির সাবেক চেয়ারম্যান কুলসুম মান্নান, মেয়ে তানজীলা মান্নানসহ তিন পরিচালককে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একইসঙ্গে আত্মসাৎ করা অর্থ আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে বিআইএফসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মেজর (অব.) মান্নান আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে ২০০ কোটি টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফেরত দিয়েছেন ১২০ কোটি টাকা। এরপরও মেজর মান্নানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিআইএফসির পাওনা রয়েছে মোট ৫১৮ কোটি টাকা।
বিআইএফসির আমানতের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান। ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের মাধ্যমে জানান, তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলবেন না।