শান্তিনগর-ঝিলমিল ফ্লাইওভার পাঁচ কিলোমিটার কমছে

ঢাকার শান্তিনগর থেকে শুরু করে মাওয়া রোডসংলগ্ন ঝিলমিল পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের ছয় বছরের মাথায়

বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। চলমান অন্য তিনটি প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এখন এর দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটার কমিয়ে আট কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হচ্ছে। সংশোধিত নকশা অনুযায়ী ঢাকার ফকিরাপুল মোড় থেকে শুরু করে বিজয়নগর, পল্টন, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় গিয়ে এটি শেষ হবে। খুব শিগগিরই সংশোধিত প্রকল্প চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের নাম সংশোধন করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) সম্পন্ন হতে যাওয়া প্রকল্পটিতে সরকারি অংশে ব্যয় বেড়েছে ২৭৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক)। এদিকে এ ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে সমন্বয়হীনতা দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন একজন নগর বিশেষজ্ঞ।

পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ফ্লাইওভারটি রাজধানীর শান্তিনগর হয়ে পল্টন, গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার, বাবুবাজার হয়ে মাওয়া সড়ক পর্যন্ত হওয়ার কথা ছিল। এ রুটে ফ্লাইওভারটি হলে বাস্তবায়নাধীন বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি-৩) মেট্রোরেল লাইন-১ ও সেনাবাহিনীর বাস্তবায়নাধীন এন-৮ প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হতো। এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই এর নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশনকে জানিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক)।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র থেকে সরাসরি রাজউকের আবাসন প্রকল্প ঝিলমিল পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগের পর কেরানীগঞ্জের মাওয়া সড়ক সংলগ্ন রাস্তার দু’পাশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বৃহৎ আবাসন কোম্পানিগুলো সেখানে বিপুল অর্থলগ্নি করে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে। ১৩ কিলোমিটার লম্বা ফ্লাইওভার দিয়ে ঢাকা থেকে স্বল্প সময়ে ওই এলাকায় যাওয়ার সুযোগ হওয়ার আশায় অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ওইসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া, পদ্মা সেতু ঘিরে ওই এলাকা নিয়ে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করে। এ অবস্থায় ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়ায় হতাশ হতে পারেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ, কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝিলমিল আবাসিক এলাকা পর্যন্ত সড়ক পথের দূরত্ব ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার। এ পরিমাণ রাস্তা পার হতে বাড়তি সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা। 

মাওয়া রোড সংলগ্ন একটি বেসরকারি আবাসিক পল্লীতে প্লট কেনা ব্যাংকার আবদুল হামিদ জানান, শান্তিনগর থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত            

ফ্লাইওভার হবে ভেবেই ওখানে প্লট কিনেছিলাম। তখন ভেবেছি, ফ্লাইওভার দিয়ে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে মূল ঢাকায় আসা সম্ভব হবে। এখন ফ্লাইওভার চুনকুটিয়া পর্যন্ত হলে বাকি পথ পাড়ি দিতে বাড়তি সময় লাগবে। তাতে ওখান থেকে ঢাকায় এসে নিয়মিত অফিস করা সম্ভব হবে কি না, তা বোঝা যাচ্ছে না। 

পিইসি সভায় রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ফ্লাইওভারটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হবে। এর চূড়ান্ত নকশা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে উপস্থাপন করা হবে। এখন পর্যন্ত শিডিউল পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সম্মতি দিলে কোন বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে পার্টনারশিপ হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রকল্পটি হলে রাজধানীর বিস্তৃতি বাড়বে। রাজউকের ঝিলমিল প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে রাজধানীর। 

পিইসি সভা থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে পিপিপির আওতায় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। ওই সময় সরকারি অর্থায়নের অংশ ছিল ৪৪২ কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাবনা অনুসারে ফ্লাইওভারটিতে সরকারি অংশ হবে ৭১৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে সরকারি অংশে ব্যয় বাড়ছে ২৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের দৈর্ঘ্য কমেছে পাঁচ কিলোমিটার। এজন্য প্রকল্পের বিভিন্ন কম্পোনেন্টে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের জন্য স্বল্প তালিকা (শর্ট লিস্টিং) করা হয়েছে। ছয়টি কোম্পানি আবেদন করলেও তিনটিকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত নির্বাচিত কোম্পানিই ড্রয়িং ও ডিজাইন থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ পর্যন্ত সম্পন্ন করবে। তারপর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত টোল আদায় করে তাদের বিনিয়োগকৃত টাকা তুলে নিয়ে সরকারকে হস্তান্তর করবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, নতুন প্রস্তাবনা অনুসারে প্রকল্পে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। মোট দৈর্ঘ্য হবে ৮ দশমিক ১০ কিলোমিটার, যার মধ্যে চার লেনযুক্ত ফ্লাইওভার হবে ৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার। আর দুই লেনযুক্ত হবে ২ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার। প্রকল্পের আওতায় চার লেনের চতুর্থ বুড়িগঙ্গা ব্রিজ করা হবে, যার দৈর্ঘ্য হবে ৪৪২ মিটার। এর র‌্যাম্প ও ডাউন র‌্যাম্প হবে তিনটি করে। আর দুটি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে।

ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ১৬৫ দশমিক ৩০ শতক জায়গা অধিগ্রহণ ও ৩ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এজন্য স্থাপনার জন্য আধা ক্ষতিপূরণেরও ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ফ্লাইওভার নির্মাণে বিদেশ থেকে ৯০ জনমাস পরামর্শক আনা হবে, যাদের সঙ্গে দেশি ৫০০ জনমাস স্টাফ কাজ করবেন। কোনো প্রকল্পে মোট সময়কে মাসের সঙ্গে তুলনা করে মোট কর্মকর্তা দিয়ে ভাগ করলে যা হয়, তা-ই জনমাস।

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ‘শান্তিনগর থেকে ঢাকা মাওয়া রোড (ঝিলমিল) পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণসংক্রান্ত পিপিপি প্রকল্পের লিঙ্ক প্রকল্প’ নামে এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। এরপর ২০১৪ সালে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্টের প্ল্যানের সামঞ্জস্যতা, জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ, এলাইনমেন্ট নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়।

ওই কমিটির সুপারিশে বলা হয়, প্রকল্পটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা আবার বিবেচনা করতে হবে। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করার দরকার রয়েছে। এরপর ২০১৭ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঢাকা শহরের পরিবহন যোগাযোগবিষয়ক সভা হয়। এতে ফ্লাইওভারটি ফকিরাপুল থেকে চুনকুটিয়া পর্যন্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ফলে এই প্রকল্পটির নাম ‘লিংকের’ জায়গায় ‘সহায়ক’ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত। কোনোভাবেই তাড়াহুড়া কাম্য নয়। দেখা যায়, যেনতেনভাবে প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে পরে তার নকশা সংশোধন করা হয়। এটা চরম অদূরদর্শিতাই শুধু নয়, সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বৃদ্ধির নামে সরকারি অর্থের অপচয় করা। এজন্য উন্নয়নে সমন্বয়হীনতা দূর করা প্রয়োজন।’