মিজান-বাছির ঘুষ লেনদেন

আসামি হচ্ছেন দুদকের সাবেক পরিচালক আজিজ

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক পরিচালক আবদুল আজিজ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। দুদক কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ডিআইজি মিজান, দুদকের পরিচালক (সাময়িক বরখাস্ত) এনামুল বাছিরের সঙ্গে আজিজ ভূঁইয়াকেও এ মামলায় আসামি করা হবে। সন্দেহভাজন আসামির তালিকায় আছেন লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আবদুল দয়াছও। তবে তাকে আসামি করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ডিআইজি মিজান অভিযোগ করেছেন, তদন্ত থেকে বাঁচতে তিনি দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা এনামুল বাছিরকে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিন সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করে দুদক। সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর নয়াপল্টনের একটি আবাসিক হোটেলে দুদকের সাবেক পরিচালক, লন্ডনপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও ডিআইজি মিজানের বৈঠকের তথ্য পাওয়া যায়। এরই মধ্যে দুদকের সাবেক দুই পরিচালক আজিজ ভূঁইয়া ও জায়েদ হোসেন খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে

দুদক টিম। জায়েদ খানের সঙ্গে নামের অমিল এবং তার ওই সব বৈঠকে অংশ নেওয়ার প্রমাণ মেলেনি। তবে আজিজ ভূঁইয়ার বৈঠকে অংশ নেওয়া ও ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। দুটি অভিযোগের অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে কমিশনে দুদক টিমের প্রতিবেদন দাখিল করার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিজান-বাছিরের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান দলের প্রধান শেখ মো. ফানাফিল্যা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে।’ তিনি দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে দুদক মুখপাত্র প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সদ্য সাবেক পরিচালক আবদুল আজিজ ভূঁইয়া দোষী কি নির্দোষ এটা বলার সময় এখনো আসেনি। অনুসন্ধান চলছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ সাবেক পরিচালক জায়েদ খানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক আগে অবসরে যাওয়া জায়েদ হোসেন খান বলেছেন, তিনি ওই বৈঠকে অংশ নেননি এবং বৈঠকে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে তার পরিচয় নেই। তা ছাড়া তার নাম “জাহিদ” নয় বরং জায়েদ।’ সেখানে কেন, কোন জাহিদের নাম উচ্চারিত হয়েছে বিষয়টি তার জানা নেই।

নয়াপল্টনের একটি হোটেলে ডিআইজি মিজান ও দুদকের সাবেক পরিচালক আজিজ ভূঁইয়াসহ ঘুষ লেনদেনের ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ গোপন বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি লন্ডনপ্রবাসী আবদুল দয়াছ। বিষয়টি জানতে ফোন করা হলে প্রশ্নটি শোনার পরই লাইন কেটে দেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে আজিজ ভূঁইয়াকে মোবাইলে ফোন দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি। মোবাইলে খুতে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি তিনি।

দুদকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের ঘুষ কেলেঙ্কারির বিষয়টি অনেকটাই প্রমাণিত। ডিআইজি মিজানের সঙ্গে দুদক পরিচালক বাছিরের কথোপকথনের অডিও ক্লিপের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দুজনের কণ্ঠের প্রমাণ মিলেছে। অভিযোগ ওঠার পর বাছির বলেছিলেন, তিনি ঘুষ নেননি। ডিআইজি মিজান তার কণ্ঠ জোড়া লাগিয়ে বা নকল করে অডিও ক্লিপ তৈরি করেছেন। কিন্তু ফরেনসিক পরীক্ষায় তার বক্তব্য টেকেনি। তিনি যেভাবে কথা বলেন, সেভাবেই একটির পর একটি শব্দ বা বাক্য বলেছেন। পরিকল্পিতভাবেই ডিআইজি মিজান তার মোবাইল ফোনে ওই কথা ধারণ করেন। মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হবে। সেখানে আসামি করা হবে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া দুদক পরিচালক আবদুল আজিজ ভূঁইয়াকেও। তাকে এ পরিকল্পনার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বাছির ছাড়াও দুদকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার নাম উচ্চারণ করেছেন।

তারা আরও জানান, দুদক টিমের জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক পরিচালক আজিজ ভূঁইয়া বলেছেন, ডিআইজি মিজানের সঙ্গে আগে থেকেই তার পরিচয় ছিল। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথাও হয়েছে। তবে তিনি নয়াপল্টনের হোটেলে কোনো বৈঠকে অংশ নেননি। তিনি ডিআইজি মিজানের সঙ্গে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তাদের মধ্যে যেসব কথা হয়েছে, সেটা তিনি (মিজান) মোবাইল ফোনে ধারণ করে থাকতে পারেন। আজিজ ভূঁইয়া সর্বশেষ দুদক পরিচালক হিসেবে রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি অবসরে গেছেন। তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধান টিম ওই হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভির ফুটেজ ও অডিও ক্লিপ সংগ্রহ করেছে। ঘটনাটি অনেক দিন আগের হওয়ায় কিছু ফুটেজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিলিট হয়ে গেছে বলে হোটেল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অডিও ক্লিপে ডিআইজি মিজান, লন্ডনপ্রবাসী আবদুল দয়াছ ও আজিজ ভূঁইয়ার কণ্ঠ পাওয়া গেছে। তারা অনেকের নাম সেখানে টেনে এনেছেন। ওই বৈঠকে ‘দুদকের জাহিদ’ নামে আরও একজনের বিষয় আলোচিত হয়।