হত্যা-ধর্ষণ-আক্রমণের শত ঘটনার ভিড়েও কিছু সংবাদ পড়ে থমকে যেতে হয়। নয় মাসের শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করা হয় আর এমন ঘটনা দেশজুড়ে ঘটতে থাকে তখন প্রশ্ন উঠতেই পারেÑ মানুষের নিষ্ঠুরতার সীমা কি এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। ঘরে, বাইরে, স্কুলে, মাদ্রাসায় কোথাও কন্যাশিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যেন কোনো উপায় নেই। শিশু সায়মার বাবা বলছেন, আমি আমার মেয়েকে রক্ষা করতে পারিনি। আপনারা আপনাদের মেয়েদের রক্ষা করুন। এই আকুতি এরই মধ্যে কন্যাশিশুদের বাবা-মাদের অন্তরে ধ্বনিত হচ্ছে। শিশু ও কিশোরীদের বাবা-মারা নিশ্চয়ই তাদের সন্তানদের উৎকণ্ঠিত থাকেন, এসব ঘটনা জানার পর তাদের উদ্বেগ অনেকগুণ বেড়েছে, বাড়ছে সতর্কতাও। কিন্তু, ধর্ষণ ও হত্যা কমবে কীভাবে? কেন এই নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতা?
গত শুক্রবার রাজধানীর ওয়ারীতে সাত বছরের শিশু সামিয়া আফরিন সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় হারুন অর রশিদ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবুল খায়ের বেলালী গ্রেপ্তারের পর একাধিক শিশুছাত্রীকে ধর্ষণের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার ফতুল্লার মাহমুদপুরে ১২ শিশুছাত্রীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল আমিনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। এর আগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি অক্সফোর্ড হাইস্কুলের শিক্ষক আরিফুল ইসলামকে ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ধানম-ির একটা বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। বরিশালের গৌরনদীতে ধর্ষণের শিকার হয় আরেক শিশু। এক বছর ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অল্প কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ধর্ষণের শিকার নয় বছরের আছিয়া।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানাচ্ছে, গত ছয় মাসেই ৮৯৫ শিশু যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১০৪ শিশুকে। যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের আঘাত সইতে না পেরে ৪০টি শিশু আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে আরও ৪১ শিশুর। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে ৮৬ জন, ২০১৩ সালে ১৭৯, ২০১৪ সালে ১৯৯, ২০১৫ সালে ৫২১, ২০১৬ সালে ৪৪৬ এবং ২০১৭ সালে ৫৯৩ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
যে শিশুর প্রতি আপন-পর নির্বিশেষে সবার স্নেহ-প্রীতি-বাৎসল্য সহজাত, তারাই কেন প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও খুনের শিকার হচ্ছে। অভিভাবকরা নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, তার সন্তানকে বিদ্যালয়ে বা ঘরের বাইরে পাঠালে নিরাপদে ফিরে আসবে কি না। একধরনের নিরাপত্তাহীনতা আর শঙ্কার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। হাসপাতাল, বিদ্যালয় এমনকি খেলার স্থান কোথাও নিরাপদ থাকতে পারছে না শিশুরা।
প্রশ্ন উঠছে, সমাজে কেন জঘন্য অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার মতো নিষ্ঠুরতা যেমন আমাদের দেখতে হয়েছে, তেমনি বাড়ছে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শিশুধর্ষণ, ধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল এমনকি অর্থ আদায়ের চেষ্টা। কেউ কেউ বলছেন, সমাজের অবরুদ্ধতা ও রক্ষণশীলতার কারণে অবদমন বাড়ছে, এগুলো অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। কারও মতে, ইয়াবার মতো মাদকদ্রব্য অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির বিস্তার অপরাধীদের প্ররোচনা দিচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে থাকা বখাটে ও মাস্তানদের দৌরাত্ম্যের কথাও আলোচনায় আসছে।
কারণ খোঁজা গুরুত্বপূর্ণ, ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ এর প্রতিকার বের করা। এই অপরাধ প্রবণতার কারণগুলো চিহ্নিত করে সে মোতাবেক প্রতিরোধের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিটি ঘটনায় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পন্ন করে দণ্ড কার্যকর নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগের প্রতিরোধ সবচেয়ে জরুরি। এজন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে তৎপর হতে হবে। কোথাও কোনো ব্যত্যয় বা দুর্বলতা থাকলে সমাধান করতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে ধর্ষণ ও হত্যার মতো নৃশংসতা থেকে রক্ষা করতে হবে দেশকে।