সরকারের গৃহঋণ পেতে অনেক জটিলতা ও ঘুষের কারবার

গত বছরের জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত গৃহনির্মাণ ঋণের নীতিমালা জারির পর এক বছরে মাত্র ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ঋণ নিতে পেরেছেন। ঋণের জন্য আবেদন করেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের ঘুষ না দেওয়ায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও এ ঋণ পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আইবাস প্লাসপ্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে

 

 যেসব সরকারি চাকরিজীবী বেতন-ভাতা পান না, তারা ঋণের জন্য আবেদনই করতে পারছেন না। এ কারণে শুধু সচিবালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ অল্প কিছু দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঋণের আবেদন করতে পারছেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে চেকের মাধ্যমে বেতন হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান চেষ্টা করেও এ ঋণ সুবিধা নিতে পারেননি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ফ্ল্যাট ও প্লট কিনতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত গৃহনির্মাণ ঋণের নীতিমালা জারি হয় গত বছরের ৩০ জুলাই, যা ওই বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন তারা। যেকোনো সরকারি চাকরিজীবী ১০ শতাংশ সুদে এই ঋণ নিতে পারবেন। ২০ বছর মেয়াদি এ ঋণের পাঁচ শতাংশ সুদ ঋণগ্রহীতা পরিশোধ করবেন। বাকি পাঁচ শতাংশ সরকার মাসিক কিস্তিতে ভর্তুকি দেবে।

নীতিমালা কার্যকর করার পর এক বছর কেটে গেলেও এ পর্যন্ত ১৫ জন ঋণ নিতে পেরেছেন। আরও প্রায় ৮৫ জন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক সুপারিশ (জিও) পেলেও ঋণ পাননি। জিও দিতে অর্থ বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ দুই দিন সময় লাগে। ৮৫টি আবেদনের বিপরীতে অনেকগুলোর বিপরীতে প্রাথমিক জিও দেওয়ার পর কয়েক মাস কেটে গেলেও ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। আর ব্যাংকগুলোতে কী পরিমাণ আবেদন জমা আছে, তারও কোনো তথ্য নেই সরকারের কাছে।

গৃহনির্মাণ ঋণের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য। গতকাল রবিবার তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার এক বন্ধু সরকারের একটি প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)। তিনি নিজে অনেক দিন আগে ব্যাংকে এই ঋণের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু ঋণ পেতে ব্যবসায়ীরা যেভাবে কর্মকর্তাদের খুশি করেন, আমার বন্ধু তা করেননি। তাই তিনি ঋণ পাচ্ছেন না।’ তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে বন্ধুটি আমার কাছে এসেছিলেন। যে ফ্ল্যাট কিনতে ঋণ নেওয়ার কথা, সেখানে ব্যাংক থেকে ইঞ্জিনিয়ার পাঠিয়ে সবকিছু ঠিক আছে কি না, তা দেখা হয়। বন্ধুর ক্ষেত্রে এই কাজ করতে ব্যাংক সময় নিয়েছে তিন মাস। আর ব্যাংকের আইনজীবী সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন। তিনি সময় নিয়েছেন এক মাস। সরকারি চাকরিজীবীরা ব্যাংকারদের খুশি না করায় তারা এসব ঋণ আবেদন গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না।’

অর্থ বিভাগের বাজেট শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আট মাস আগে আমি ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নিতে আবেদন করেছি। এখনো আবেদনটি ব্যাংকেই পড়ে আছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাকরি করার কারণে ব্যাংকাররা ঘুষও নিতে পারছে না, আবার ফাইলও ছাড়ছে না। ঋণটি পাওয়ার জন্য ঘুরতে ঘুরতে বিরক্ত হয়ে গেছি।’

নীতিমালা জারির পর রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিজীবীদের এ ঋণ দেওয়ার কথা। নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো চাকরিজীবী ঋণ পাওয়ার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের যেকোনো একটিতে আবেদন করবেন। ব্যাংক ওই আবেদন যাচাইবাছাই করে ইএমআই শেষে আবেদনকারী কর্মকর্তা যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরত আছেন, ওই মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। ওই মন্ত্রণালয় থেকে তা অনুমোদন করে অর্থ বিভাগে ‘গৃহ নির্মাণ ঋণ কোষ’ শাখায় পাঠানো হবে। তখন এ শাখা থেকে প্রাথমিক জিও জারি করে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেওয়া হবে। তার ভিত্তিতে ব্যাংক ঋণ দেবে।

ঋণ দেওয়ার পর অর্থ বিভাগ চূড়ান্ত জিও জারি করে আইবাস প্লাসপ্লাসে ওই কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যাতে প্রতি মাসে সুদের ভর্তুকির অর্থ স্থানান্তর হয়, সে ব্যবস্থা করবে। ঋণ নেওয়ার পর ২০ বছর বা ঋণগ্রহীতার পিআরএলের মধ্যে যেটি আগে হবে, ততদিন প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভর্তুকির অর্থ পৌঁছে যাবে। নতুন বাজেটে গৃহনির্মাণ ঋণ খাতে সুদ ভর্তুকি বাবদ ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ঋণ বিতরণে গতি না আসায় ভর্তুকির এ অর্থ খরচ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বলেন, ‘সরকারের উপসচিব থেকে ঊর্ধ্বতনদের গাড়ি কেনার জন্য যে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তা বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা ও ব্যাংকারদের অসহযোগিতার কারণে এটি (গৃহনির্মাণ ঋণ) তেমন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমরা। তারা জানিয়েছে, নীতিমালাটি নতুন হওয়ায় এ ঋণ বিতরণে গতি আসছে না। এ সমস্যা দূর করতে আমরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেও ঋণ বিতরণের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি। এ ছাড়া কিছু মানুষ আছেন, যারা সুদ খায়ও না, দেয়ও না। তাদের জন্য ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এ ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালে তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আইবাস প্লাসপ্লাস সফটওয়্যার উদ্বোধন করেন। তারপর থেকে সচিবালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ ঢাকায় সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে হচ্ছে। ঢাকাসহ সারা দেশের বাকিদের বেতন হচ্ছে চেকের মাধ্যমে। যেহেতু এই ঋণের সুদ ভর্তুকির টাকা সরকার থেকে আইবাস প্লাসপ্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাই যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন এখনো এ সফটওয়্যারের আওতায় আসেনি, তারা এ ঋণ নিতে পারছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বলেন, ‘সচিবালয়সহ অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেতন হচ্ছে।’ নিজ কক্ষ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভবন দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনো সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ সফটওয়্যারের আওতায় আসেননি। আইবাস প্লাসপ্লাসে না থাকার কারণে বিপিসি ও বিআরটিসির চেয়ারম্যানও এই ঋণ নিতে পারেননি।’

তিনি জানান, দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়াসহ সরকারের সব ধরনের আর্থিক কর্মকাণ্ড আইবাস প্লাসপ্লাস সফটওয়্যারের আওতায় আনার কাজ চলছে। এ জন্য পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় ২০২৩ সাল নাগাদ সরকারের সব ধরনের আর্থিক কর্মকাণ্ড এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ২০২১ সালের মধ্যেই সব চাকরিজীবীর বেতন এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিশোধ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

নিয়ম অনুযায়ী, চাকরিজীবীর বেতন যে শাখার যে হিসাবে হবে, ওই হিসাব থেকেই ব্যাংকঋণের কিস্তি কেটে রাখবে। আর সরকারের ভর্তুকিও ওই হিসাবে জমা হবে। কিন্তু যারা চেকের মাধ্যমে বেতন পান, তারা চেক কোন ব্যাংকের কোন হিসাবে জমা দেবেন, তার নিশ্চয়তা না থাকায় তাদের ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার সরকার ঋণগ্রহীতার ঋণের সুদের ভর্তুকি কোন হিসাবে দেবে, তারও ঠিক নেই।

 

এ পরিস্থিতি দূর করতে যারা আইবাস প্লাসপ্লাসের মাধ্যমে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না, সে ধরনের চাকরিজীবীদের কীভাবে তার আগেই এই ঋণ দেওয়া যায়, তা নিয়ে ভাবছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে একটি বৈঠক ডাকা হবে। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ঋণগ্রহীতার একটি নির্দিষ্ট হিসাব চূড়ান্ত করে ইএফটির মাধ্যমে তাকে এ ঋণ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হবে, যাতে ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া হিসাব পরিবর্তন করা না যায়।