পতনের ধারায় পুঁজিবাজার

২০১৭ সালে কিছুটা ঊর্ধ্বগতির পর ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট ও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সালে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে পুঁজিবাজার। নির্বাচন শেষে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এমনটাই প্রত্যাশা করেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। প্রত্যাশা অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে সূচকের ঊর্ধ্বগতিও দেখা দেয়। তবে এরপর থেকে আবারও পতনের ধারায় নেমে আসে বাজার পরিস্থিতি। তিন মাসেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ পতনে বাজেটে প্রণোদনার দাবি জানান বিনিয়োগকারীসহ স্টেকহোল্ডাররা। সরকারের পক্ষ থেকে আশ^াসও দেওয়া হয়। বাজেটে প্রণোদনার অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। তবে প্রণোদনার পরও ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি পুঁজিবাজারে।

গত ৩০ জুন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদনের পর পাঁচ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে চার কার্যদিবসই পতনের ধারায় ছিল পুঁজিবাজার। অধিকাংশ শেয়ারের দরহ্রাসের কারণে এ সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক হারিয়েছে ১০৩ পয়েন্ট। চলতি বছরের জানুয়ারি-পরবর্তী পুঁজিবাজারে যে ধারাবাহিক পতন দেখা দিয়েছিল, এখন আবার সেই পুরনো ধারাতেই ফিরে গেছে পরিস্থিতি। গতকালও ডিএসইর ৬৭ শতাংশ সিকিউরিটিজের দরহ্রাসে ডিএসইএক্স কমেছে ৪৭ পয়েন্ট। লেনদেন কমে গেছে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ।

চলতি বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। সাথে বোনাস লভ্যাংশের সুযোগও রাখা হয়। তবে বোনাস লভ্যাংশ দিতে হলে তা নগদের সমপরিমাণ দিতে হবে। কোনো কোম্পানি নগদের চেয়ে বোনাস লভ্যাংশ বেশি দেয় তাহলে উক্ত বোনাস ইস্যুর ওপর ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। এছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিট লাভের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়ার শর্তও দেওয়া হয়। এছাড়া বিনিয়োগকারীর করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজারে উন্নীত করা হয় বাজেটে। তবে এসব প্রণোদনার কোনো প্রভাবই পড়েনি।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাজেট পাসের পর প্রথম কার্যদিবসে ৩৬ পয়েন্ট হারায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক। পরের দিন সূচক ৮ পয়েন্ট হারালেও তৃতীয় দিন তা পুনরুদ্ধার করা হয়। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চম দিন আবারও পতন দেখা যায় বাজারে। সব মিলিয়ে গত পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইর এ সূচকটি প্রায় ২ শতাংশ পয়েন্ট হারায়।

বাজেট পাসের পর গত পাঁচ কার্যদিবসে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে টেলিযোগাযোগ খাত। সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি সরকারের পাওনা আদায়ে সম্প্রতি গ্রামীণফোনের ইন্টারনেটের গতি ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিটিআরসি। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সঙ্গে টানাপড়েনের কারণে বিদেশিরা এ কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করছেন, যা সূচকে বড় প্রভাব ফেলছে। গত পাঁচ কার্যদিবসে এ শেয়ারটি প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ দর হারিয়েছে। এছাড়া ব্যান্ডউইডথের মূল্য কমিয়ে দেওয়ায় কিছুদিন ধরেই ধারাবাহিক দরপতনে রয়েছে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি। সব মিলিয়ে গত পাঁচ কার্যদিবসে এ খাতটি গড়ে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ দর হারিয়েছে।

সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক খাত গত পাঁচ কার্যদিবসে ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ সময় সিরামিক ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ও সিমেন্ট খাত হারিয়েছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ দর। লোকসানে থাকা পাট খাত হারিয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ বাজার মূলধন। এছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যালস ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, জ¦ালানি ১ শতাংশ, খাদ্য ও অনুষঙ্গ ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ, বস্ত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ, বিবিধ খাত ৩ দশমিক ১২ শতাংশ, সেবা ও নির্মাণ খাত হারিয়েছে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ দর।

বিপরীতে জীবন বীমা, সাধারণ বীমা, পেপার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দর বেড়েছে। গত পাঁচ কার্যদিবসে মিউচুয়াল ফান্ডের দর বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া জীবন বীমা কোম্পানির দর গড়ে ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সাধারণ বীমার দর ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ ও কাগজ খাতের দর কমেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।