দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুর বিস্তার সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও গত জুনে রোগটির প্রকোপ বেড়ে যায়। এক লাফে পাঁচ গুণে দাঁড়ায়। এমনকি এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর বিস্তার গত বছরের এ সময়ের তুলনায় সাত গুণ বেশি। বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও।
বিস্তারের পাশাপাশি বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার ডেঙ্গুর ধরনেও মারাত্মক পরিবর্তন এসেছে। গত বছর পর্যন্ত তিন ধরনের ডেঙ্গুর কথা জানা
গেলেও এবার ডেন-৩ ও ডেন-৪ সংমিশ্রণে নতুন ধরনের ডেঙ্গুর দেখা মিলছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু বিস্তারকারী এডিস মশার প্রতিষেধক প্রতিরোধের ক্ষমতাও বেড়েছে। অর্থাৎ মশা মারতে দেশে যে ধরনের ওষুধ ও পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে, তা আর কাজে লাগছে না।
এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা এসেন্ডের কান্ট্রি হেড ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত জুলাই থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর মৌসুম। এবার মে-জুন থেকেই শুরু হয়েছে। থাকবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এবার ডেঙ্গুর প্রকোপটা বেশি সময় নিয়ে থাকবে। সুতরাং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সতর্ক থাকতে হবে।
এবার ডেঙ্গুর বিস্তারও বেশি উল্লেখ করে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার মারার ওষুধ ছিটালেও ঠিক কীভাবে ও কোন জায়গায় ওষুধ দিতে হবে, তা মানি না। গড়ে সব জায়গায় ওষুধ দিই। ফলে গত কয়েক বছরে এডিস মশার বিস্তার বেড়েছে। এছাড়া মশার প্রতিষেধক ক্ষমতাও বেড়েছে। ফলে মশার মারার ওষুধে কাজ হচ্ছে না। এডিস মশার জীবাণু চক্রাকারে অন্য এডিসের মধ্যে আরও শক্তভাবে স্থান করে নিচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, চার ধরনের ডেঙ্গুর (ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪) মধ্যে ঠিক কোন ধরনের ডেঙ্গুর প্রকোপ বাংলাদেশে বেশি, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এখন জ¦র হলে মানুষ যেমন প্রথমে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার ভয় পায়, তেমনি ডাক্তাররাও তা শনাক্ত করে চিকিৎসা করেন। কিন্তু যার ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে, তা ঠিক কোন টাইপের ডেঙ্গু, তা শনাক্ত করা হচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু পরীক্ষার পাশাপাশি টাইপিংও করতে হবে। না হলে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া যাবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার পরিস্থিতি খারাপই বলা যায়। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের অনেকে এক-দুই দিনের জ¦রে খারাপ অবস্থায় চলে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা এরই মধ্যে বৈঠক করেছি। সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের কাছে দিক-নির্দেশ পাঠিয়েছি। পুরনো গাইডলাইন নতুন করে প্রকাশ করে সব জায়গায় পাঠানো হয়েছে।
ডেঙ্গুর ধরন শনাক্ত হচ্ছে কি না জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, দেশে কীটতত্ত্ববিদের অভাব। দেড় কোটি বেশি মানুষের এই শহরে কীটতত্ত্ববিদ তিন-চারজন। সারা দেশে এই সংখ্যা সাত-আটজন। পদ মাত্র ২২-২৩টি। অথচ ৬৪ জেলায় ৬৪ কীটতত্ত্ববিদ পদ দরকার। প্রত্যেক জেলায় ইউনিট থাকতে হবে। তা না হলে ঠিক কী ধরনের ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে তা জানা সম্ভব নয়। আর এটি সম্ভব না হলে যথার্থ চিকিৎসাও পাবে না রোগীরা। কীটতত্ত্ববিদ এ কথাও বলেন, এবার বর্ষা মৌসুমে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ তাড়াতাড়ি শুরু হয়েছে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত হলে ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশার লার্ভা পানিতে ভেসে যায়। লার্ভা থেকে মশা হতে পারে না। এবার বৃষ্টিপাত নেই। তাই এডিস মশার প্রজনন বেড়েছে।
এক মাসে পাঁচ গুণ বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি থেকে মে) রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৩২৪। কিন্তু গত মাসে তা এক লাফে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ অর্থাৎ ১ হাজার ৭৫০ জনে দাঁড়ায়। এ মাসের প্রথম আট দিনে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৮২ জন। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ এ মাসে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু মশার ধরন পাল্টে যাওয়ায় চিকিৎসকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। জ¦রে আক্রান্ত রোগীকে বাসায় চিকিৎসা না দিয়ে দ্রুত হাসপাতাল কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালামও এ মৌসুমে জ¦র হলে অবহেলা না করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, জ¦র হলে অনেক সময় সাধারণ জ¦র মনে করি। ডেঙ্গু জ¦রও রোগীর কাছে সাধারণ জ¦র বলেই মনে হয়। যেকোনো জ¦রকে তারা যেন সাধারণ জ¦র মনে না করেন, অবহেলা না করেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নেন, ডেঙ্গু পরীক্ষা করেন। যদি পরীক্ষা করে দেখা যায় ডেঙ্গু নেগেটিভ তবেই সাধারণ বা অন্য কোনো জ¦র হতে পারে। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।
এবার সাত গুণ বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪২৮ জন। এর মধ্যে জুনে আক্রান্ত হয়েছিল ২৯৫ জন। মৃত্যু হয়েছিল চারজনের। এ বছর একই সময়ে আক্রান্ত দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে গত মাসে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৭১৩ জন, যা গত বছর জুনে আক্রান্তের প্রায় সাত গুণ বেশি। সরকারি হিসাবে এ বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দেশে আক্রান্ত হয় ৩ হাজার ২৫৬ জন। এর মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬৩৩ জন।
ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতিতে গতকালও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জরুরি বৈঠক হয়। এতে অংশ নেন বেশ কয়েকজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা আগের গাইডলাইন (নির্দেশিকা) সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি জোর দেন অপেক্ষাকৃত বয়োকনিষ্ঠ (জুনিয়র) চিকিৎসকদের অধিকতর প্রশিক্ষণের ব্যাপারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। মৃত্যুর খবরও বেশি। আমরা তিনজনের মৃত্যু তালিকাভুক্ত করলেও আরও চারজনের খবর পেয়েছি। তাদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমরা আইইডিসিআরের কাছে পাঠিয়েছি।