টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত পাহাড়ের ৫ জেলা

বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের পাঁচ জেলার পাহাড়ি এলাকা। সড়ক ডুবে সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বান্দরবানের। বিরামহীন বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের জনজীবন। পাহাড়ধসের শঙ্কাও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ওই এলাকার বাসিন্দাদের। তবে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে স্থানীয় প্রশাসনও সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা।

বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

গত শনিবার থেকে চার দিনের টানা বৃষ্টিতে বান্দরবানের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের বাজালিয়ায় এলাকা ডুবে যাওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে যান চলাচল বন্ধ করে দেন পরিবহন মালিকরা। ফলে কোনো দূরপাল্লার যানবাহন বান্দরবান ছেড়ে যায়নি। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার থেকে আসা বাসগুলোও আটকা পড়েছে বাজালিয়ায়। যাত্রীরা পানিতে ডুবে থাকা সড়কের প্রায়

 

আধা কিলোমিটার অংশ ভ্যান, নৌকা এবং হেঁটে পার হচ্ছেন।

চট্টগ্রাম থেকে আসা যাত্রী নাজিম উদ্দিন, মো. সোলায়মান ও শহীদুল ইসলাম জানান, ‘সকাল সাড়ে ৭টার বাসে উঠেছি। ১০টার দিকে এখানে পৌঁছে দেখি বাস আর যাচ্ছে না। তাই পানিতে ডুবে থাকা অংশটি নৌকায় পার হয়ে সিএনজি অটোতে চড়ে বান্দরবান যেতে হচ্ছে।’

এদিকে অব্যাহত বর্ষণে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীতীরে বসবাস করা প্রায় একশ পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ত্রাণ শাখা, লামা এবং বান্দরবান পৌরসভা গত সোমবার দুপুর থেকে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে খিচুড়ি এবং পানীয়জল সরবরাহ করছে।

কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে দুই লাখ মানুষ

 

কক্সবাজার জেলায় বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে দুই লক্ষাধিক মানুষ। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিতে আছে ৯৯৮টি পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ। তাই তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে সদর উপজেলায় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে মাইকিং করা হচ্ছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে কক্সবাজারে চার দিন ধরে টানা বর্ষণ হচ্ছে। এ কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত গত ৬ ঘন্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আরও কয়েক দিন ভারী ও মাঝারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানান, কক্সবাজার শহরসহ প্রতিটি উপজেলায় মাইকিং করে পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সিপিভি ভলান্টিয়ার, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, এনজিওসহ বিভিন্ন গ্রুপ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে অতি ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিয়ে আসবে। কেউ যাতে মানবিক বিপর্যয় ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির শিকার না হয়।

চট্টগ্রামের চার উপজেলা প্লাবিত

চার দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার আনোয়ারা, পটিয়া, চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার কিছু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শঙ্খ নদের পানি বেড়ে আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলের ক্ষেত ও পুকুর। প্রবল বর্ষণে উপজেলার রায়পুর, জুঁইদ-ী, চাতরী, বৈরাগ, বরুমচড়া ও পরৈকোড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলবদ্ধতা। এছাড়া রায়পুর ইউনিয়নের বার আউলিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানি ঢুকে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট হাঁটুপানিতে ডুবে গেছে। এতে পানিবন্দি রয়েছে ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষ।

এছাড়া শঙ্খ নদের পানি বেড়ে চন্দনাইশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবতি হয়ে শত শত মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন ক্ষতির মুখে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় রাতে মহাসড়ক ডুবে যানবাহন চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে উপজেলার শঙ্খ নদের তীর উপচে প্রায় ৫০টি বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। এছাড়া উপজেলার গাছবাড়িয়া, দোহাজারী রায়জোয়ারা, দিয়াকুল, কিল্লাপাড়া, জামিজুরি, পূর্ব দোহাজারী, বরকল, বরমা, কাঞ্চনাবাদ এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ।

পটিয়া উপজেলার অনেক এলাকাও প্লাবিত হয়েছে চার দিনের টানা বর্ষণে। এতে মানুষের বসতঘর ভেঙে পড়েছে এবং ২০০ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে উপজেলার কেলিশহর, হাইদগাঁও, কচুয়াই, খরনা, ভাটিখাইন, ছনহরা, ধলঘাট, হাবিলাসদ্বীপ, জিরি, কুসুমপুরা, আশিয়া, কোলাগাঁওসহ পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড।

এছাড়া সাতকানিয়া উপজেলার বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের বাজালিয়া এলাকা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রাম পানিতে ডুবে গেছে।

রাঙামাটিতে মাইকিং

টানা বর্ষণে রাঙামাটির লংগদু এবং বান্দরবানের রুমা-থানচি সড়কের নয়মাইল এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে লংগদু-দিঘিনালা সড়কে ৮ ঘণ্টা এবং রুমা-থানচি সড়কে ৩ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে সড়ক থেকে মাটি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। ভারী বর্ষণে গত সোমবার সকালে লংগদু বামেছড়া এলাকার ৪-৫টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের কোনো ঘটনা না ঘটলেও লংগদু-দিঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে আট ঘণ্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে এখনো বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ায় রাঙামাটির বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করা হচ্ছে।

টানা বর্ষণে স্থবির খাগড়াছড়ির জনজীবন

টানা বর্ষণে স্থবির হয়ে পড়েছে খাগড়াছড়ির জনজীবন। জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার পৌর শহরের শালবাগান এলাকায় পাহাড়ধসে বেশ কিছু বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো হতাহত হয়নি। প্রবল বর্ষণে জেলার চেঙ্গি, মাইনি ও ফেনী নদীর পানি বেড়ে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলা শহরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসকসহ সরকারি কর্মকর্তারা। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।