বিচ্ছিন্ন ঘটনা কারে কয়

জুনায়েদ ম-ল মাঝবয়সী সদালাপী মানুষ। হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করেন। বেশ রাজনীতি সচেতন। তার ডাক্তারখানা সংলগ্ন একটি পত্রিকা বিক্রির স্টল আছে। নিজে একটি পত্রিকা রাখেন আর স্টল থেকে ধার করে আরও কয়েকটি পড়েন। রাজনৈতিক কলাম পড়ায় তার নেশা আছে। তাই আমি এদিকটায় এলে কলাম লেখক হিসেবে একটু বাড়তি সমাদর পাই। দোকানে বসে এককাপ চা খেতে হয়। তারপর আমাকে মনোযোগী শ্রোতা বানিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শুরু করেন। এক পক্ষে তো জমে না, আমাকেও অংশ নিতে হয়। আলোচনা-সমালোচনায় তারমধ্যে একটি নিরপেক্ষতা কাজ করে। তবে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন তিনি। এখানটাতেই তিনি কিছুটা রক্ষণশীল। বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা সহ্য করবেন না।

 

ম-ল সাহেব রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত। গত রবিবার বিকেলে তার চায়ের আড্ডায় রবীন্দ্রসংগীতের প্যারোডি করেই বললেন ‘স্যার, বিচ্ছিন্ন ঘটনা কারে কয়?’ বরগুনার রিফাত হত্যাকা- তাকে বেশ ভাবিয়েছে। অবশ্য এই ঘটনাটি দেশের বিবেকবান সব মানুষকেই আতঙ্কিত করেছে। আমাদের ডাক্তার সাহেব বেশি চিন্তিত এক সরকারদলীয় নেতা ও মন্ত্রীর এই ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে মন্তব্য করায়! তিনি এখন জানতে চান এই ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ কথাটির অর্থটি কী?

ম-ল সাহেবের প্রশ্নটি স্পষ্ট। যদি এদেশে সন্ত্রাস, খুনোখুনি, ধর্ষণ জাতীয় ঘটনা দৈবাৎ ঘটত আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারত তবে এক-দুটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যেত। বাংলাদেশের মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ধর্ষণ আর খুনের ঘটনা অহরহ পত্রিকার পাতাজুড়ে থাকছে। বিরোধীদলীয় ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে নির্জীব থাকায় ছাত্রলীগ নিজেরা নিজেরা মারামারি করছে। সড়ক দুর্ঘটনা রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। জ্ঞাত আর অজ্ঞাত পরিচয় লাশের অভাব হচ্ছে না। তেমন এক বাস্তবতায় রিফাত হত্যার মতো প্রকাশ্য হত্যাকা- কোন বিচারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে যায়?

 

আসলে আমাদের মনে হয় মন্ত্রী বা নেতাদের চেয়ারটাই বোধকরি ওরকম। সকলের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বই বোধ হয় এক। তাই ভাষায় ও ব্যাখ্যায় তেমন গুণগত পার্থক্য দেখা যায় না। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা যাক। রিফাত হত্যা নিয়ে যে ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে, গণমাধ্যমে যে সব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে এর সারসংক্ষেপ হলো হত্যাকারীদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তিমানদের প্রশ্রয় রয়েছে। সমাজে সংকট দেখা দিলে একটি জনকল্যাণকামী সরকার তা আড়াল করতে চাইবে কেন! বরঞ্চ তারা যে কোনো আলোচনা-সমালোচনাকে গ্রহণ করবে। ভাবতে হবে, এতে সরকার লাভবান হচ্ছে। সরকার পরিচালনাকারীরা যদি মনে করেন সন্ত্রাসী আর দুর্নীতিবাজদের শাসন করলে নিজেদের রাজনীতির বলয়টা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তবেই না সত্য আড়াল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তা নাহলে সত্যকে সত্য মেনে তার প্রতিবিধানে এগিয়ে আসাটাই কর্তব্যজ্ঞান করা উচিত।

 

আনন্দের সঙ্গেই বলতে হয় এবং এটা স¦ীকার করতেই হবে যে, অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ ক্রমাগত এগিয়ে চলছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেকটা বেড়েছে। না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমে ছোট হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। রেমিট্যান্স বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহ বাড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ায়। এমন একটি পরিবেশে বাংলাদেশের মতো জনশক্তি সমৃদ্ধ দেশের উন্নয়নের সোপান পেরিয়ে অগ্রগতির লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন নয়। তবে এমন সাফল্য পেতে হলে দুটো শর্ত পূরণ প্রয়োজন। ক. সুস্থ্য ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি এবং খ. সুশাসন প্রতিষ্ঠা। সুশাসনের পূর্বশর্ত হচ্ছে সরকার ও সমাজ জীবনে দুর্নীতি কমিয়ে আনা। দুর্ভাগ্য এই যে বাংলাদেশে এখন এই দুটি শর্ত পূরণই সবচেয়ে কঠিন। 

 

কিন্তু সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে, এদেশে শক্তিমান ক্ষমতার রাজনীতিকরা ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা’ দেওয়াকে জায়েজ মনে করেন এবং বিচারকের বিচারের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই সুবিধা মতো মামলা খারিজ করে আপন দলের সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ বা দখলদারদের দায়মুক্ত করে দেন। অন্যদিকে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ নাম দিয়ে যেখানে মিথ্যাচারকে প্রকাশ্যে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, আর নির্বাচনে টাকা ছড়ানোকে অনিবার্য বিবেচনা করা হয়, অরাজনৈতিক আমলা-বণিকদের কাছে মোটা টাকায় মনোনয়ন বিক্রি করা হয়, সেখানে দুর্নীতি হ্রাস পেতে পারে না। আর ক্ষমতাবান ও ক্রিয়াশীল রাজনীতি যখন নীতি আদর্শ ভুলে দুর্নীতিযুক্ত হয়ে পড়ে, সে দেশে হাজার সম্ভাবনা থাকলেও উন্নয়নের চাকা তেমন গতি পায় না। যে লক্ষ্যে পৌঁছার কথা সকাল ১০টায়, কপাল ভালো থাকলে সেখানে পৌঁছতে হবে রাত ১০টায়। যে দেশের রাজনীতি শব্দের সঙ্গে দুর্নীতি সমার্থক হয়ে যাচ্ছে, সে দেশের যা কিছু অগ্রগতি তার কৃতিত্ব সাধারণ পেশাজীবী মানুষের। তাদের শ্রম ও মেধার প্রতিফলন হচ্ছে এসব অগ্রগতি। ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের অনেকেই এ থেকে কোনো কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না। তারা পারেন গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ অর্জনের জন্য উন্নয়নের চাকা পেছনের দিকে টেনে ধরতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তা ও সততা না থাকলে এমন দেশের এগিয়ে চলা কঠিন হতো। হয়তো তিনি কপালগুণে কিছু সংখ্যক দেশপ্রেমিক মানুষ পাশে পেয়েছেন।

 

আজ এদেশে মুক্ত বিবেকের মানুষ হতাশামুক্ত হতে পারছে না। রাজনীতবিদদের অনেকেই সাধারণ মানুষকে ক্রমাগতভাবে মূর্খ বিবেচনা করে নিজেদের অমার্জিত আচরণ করেই যাচ্ছেন। বারবার হোঁচট খাচ্ছেন তবু সতর্ক হচ্ছেন না। অথবা বলা যায় নিজেদের গড়া অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। মুহূর্তের সুখ বা রাজনৈতিক কূটকৌশলে পাওয়া সাফল্যকে স্থায়ী ভাবছেন। আমরা সাধারণ মানুষ সরকারি কৌশল ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। তবে এ সত্যটি বেশ বোঝা যায় যে গণতন্ত্রের চর্চাহীনতা আমাদের ক্রমাগত হতাশায় নিমজ্জিত করছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা সব সংকট উত্তরণে খোলামেলাভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করতেন। সত্য আড়াল করার প্রবণতা এত প্রকট হতো না। গণতন্ত্র বিচ্ছিন্ন থাকায়, সাধারণ মানুষকে বোকা ভাবার অভ্যাস থেকে বেরুনো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু মানতে হবে সাধারণ মানুষ শাব্দিক অর্থে ‘সাধারণ’ নয়। অসাধারণ তাদের বিচার বোধ। তাই মানুষ ঠিকই মূল্যায়ন করতে পারে রাজনীতির নেতানেত্রীদের। সুতরাং কোনো সাত পুরনো কথার ফুলঝুরি নয় জনগণের আস্থায় থাকতে হলে জনগণকে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আন্তরিক হতে হবে।

 

এই বাস্তবতায় আমরা সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের কাছে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করব। এদেশের মানুষ নির্বোধ নয়। তারা জানে রাতারাতি জগদ্দল পাথর সরানো যাবে না। দেশের বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে নষ্ট রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে সক্ষমতা থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও অনেক সময় হাত-পা বাঁধা থাকে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে দিনে দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের নৈতিক স্খলন সম্পন্ন হয়েছে। অন্যভাবে বলা যায় রাজনৈতিক দূরদর্শী নীতিনির্ধারণ ছাড়া অর্থনৈতিক সংকট আর অব্যবস্থা মোকাবিলা সম্ভব নয়। তাই রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ছাড়া সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না।

 

দেশজুড়ে খুন আর ধর্ষণের মতো ভয়ানক অপরাধ জ্যামিতিকহারে বেড়ে যাচ্ছে। সড়কে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে প্রতিদিন। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিগ্রস্ততা বিপর্যস্ত করে ফেলছে সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষকে। সাধারণ মানুষের মাথায় খাঁড়ার ঘা উপর্যুপরি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। সরকার পক্ষ গ্যাস আমদানির পর নানা ভর্তুকি মেটাতে মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করছে কিন্তু সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি কমানোর পদক্ষেপ দেখাতে পারছে না। তাই অনেকেই বলছেন আমদানি-ভর্তুকি নয়Ñ দুর্নীতিবাজদের খাই মেটানোর ভর্তুকির জন্য গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। মধ্যবিত্ত দেখছে তার কষ্টার্জিত আয়ে কেনা সঞ্চয়পত্রের লাভ কমে তলানিতে এসে যাচ্ছে। ফলে সংসার নির্বাহের প্রধান অবলম্বন নিদারুণ হোঁচট খাচ্ছে। অন্যদিকে মস্ত বড় ঋণখেলাপিরা প্রণোদনা পাচ্ছে রাষ্ট্রের কাছ থেকে, এমন অবস্থায় ভেতরে ভেতরে জনবিক্ষোভ তৈরি হবেই। পাশাপাশি ভয়ংকর সব খুনখারাবিকে যদি সরকারি দায়িত্বশীল জায়গা থেকে হালকা করে ফেলা হয় তখন অন্ধকার দিনেরই অপেক্ষা করতে হবে।

 

এসব বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সরকার পরিচালকদের বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে প্রকৃত সত্য আড়াল করার দরকার কি! বরঞ্চ সংকটকে মেনেই তা মোকাবিলা করতে হবে। আমরা মনে করি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো আন্তরিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব নয়। তার আগে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যে দল বা দলগুলোর জোট থাকবে সে সব দলের নীতিনির্ধারকদের প্রথমে আত্মশুদ্ধি করে নিশ্চিত হতে হবে যে তারা গণতান্ত্রিক চেতনা-সমৃদ্ধ হয়েছেন। যখন বুকের ভেতর দেশপ্রেম অনুভব করবেন তখন ক্ষমতা প্রেম এবং এর অনুষঙ্গে অন্ধ দলপ্রেম প্রকট হবে না।

 

এমন স্বপ্নীল অবস্থা সৃষ্টি হলে রাজনৈতিক দলে যুক্ত থাকা বা দলের নাম ভাঙানো মাস্তানরা জমি দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি বুক ফুলিয়ে করতে পারবে না। এদের গডফাদাররা সরকারের ভেতর বা আশপাশে বসে মদদ দিতে পারবে না। থানা আদালত সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। ক্ষমতায় থাকার দাপটে দলে দলে অপরাধী রাজনৈতিক মামলার নামে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মুক্ত হয়ে যাবে না। এমন একটি অবস্থা তৈরি করা খুব যে কঠিন তা নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সততা ও দেশপ্রেম। প্রকৃত গণতান্ত্রিক বোধ ছাড়া তা সম্ভবও নয়। কোনো অঘটনই ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হতে পারে না। সকল অন্যায় আর সংকটকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। আমরা প্রতিদিনই প্রত্যাশা করি সব অধরা সুন্দরকে যেন ছুঁতে পারি।

 

লেখক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

ও কলামনিস্ট