কলেজে ভর্তি হতে গেলে আসন নেই, ডাক্তারের কাছে গেলে সিরিয়াল নেই, রেলে গেলে টিকেট নেই, বাসে উঠলে বসার সিট নেই, ইন্টারভিউ দিচ্ছেÑ চাকরি নেই। এ সবই একটি দেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণের লক্ষণ। বর্তমানে বাংলাদেশে যে একটা জনসংখ্যা বিস্ফোরণ চলছে তা চারদিকে তাকালেই বুঝা যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে যতগুলো সমস্যা আছে তার মধ্যে এক নম্বরে আছে জনসংখ্যা সমস্যা। বাংলাদেশে প্রতি এক মিনিটে জন্ম নিচ্ছে ৯ জন শিশু। বাড়তি জনসংখ্যার নেতিবাচক চাপ পড়ছে দেশের সব সেক্টরে এবং জনজীবনে। দেশে যে এখনো একটা বড় অংশের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, তার অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো জনসংখ্যা।
বাংলাদেশের আয়তন মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে জনসংখ্যা ১৭ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি বছর ৩০ লাখ নতুন মুখ যোগ হচ্ছে এই মোট জনসংখ্যার সঙ্গে। এই হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ কোটিতে দাঁড়াবে। যদি প্রতি বছর ৩০ লাখ লোক বাড়ে, তাহলে ৩০ বছর পর দেখা দেবে যানজটের মতো মহা জনজট বা মানুষজট। অনেকেই বলে থাকেন, পারমাণবিক অস্ত্র অপেক্ষা জনসংখ্যা বর্তমান বিশ্বের প্রধান সমস্যা। তাদের অভিমত, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ। বিশেষত আমাদের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা যুক্তি তুলে ধরেনÑ ভৌগোলিক পরিবেশ, অশিক্ষা, নিম্নমানের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব, খাদ্যাভ্যাস, শিশু বিবাহ, বহু বিবাহ, ছেলেসন্তান লাভের আশা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অজ্ঞতা, মৃত্যুর হার হ্রাস, বিনোদনের অভাব, দারিদ্র্য, কর্মহীনতা, আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রভৃতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জনসংখ্যা সীমিত রাখার জন্যই এক্ষুনি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে যেসব কুসংস্কারের ধারণা প্রচলিত আছে তা বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আমাদের দেশের নব্বই ভাগ লোক অধিক সন্তান জন্ম দেওয়ার ফলে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয় তা স¤পর্কে কখনো ভাবেন না। ফলে পরিবারে ও দেশে জনসংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জাতির ভবিষ্যৎ আজ বিপন্নতার মুখে পড়েছে। দেশে মানুষ বাড়ছে, সেই সঙ্গে খাদ্য সমস্যা প্রকট হচ্ছে। জনসংখ্যা রোধে দেশব্যাপী ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রয়োজনে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন করতে হবে। চীনে জন্মনিয়ন্ত্রণ রোধে আইন আছে, এক সন্তানের বেশি হলে ওই পরিবারকে শহরে থাকতে দেওয়া হয় না। ফলে চীন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সফল হয়েছে। তাই বাংলাদেশকে তার উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে হলে চীনের মতো আইন করে এক সন্তান নীতি চালু করা অতি জরুরি। এক সন্তান নীতি চালু করলে আগামী ৪৫ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে। সতেরো কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া যে কোনো সরকারের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া দরিদ্র দেশ, কিন্তু জনসংখ্যা কম হওয়ার কারণে, যে কোনো পরিস্থিতি তারা মোকাবিলা করতে পারে। আমরা পারি না। হাজারো সমস্যার জন্য দায়ী অধিক জনসংখ্যা। জনসংখ্যা বাড়ার ফলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে দেশের চাষযোগ্য জমির ওপর। একসময় চাষের জমি কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চীনে এক সন্তান নীতি প্রয়োগ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে শতভাগ সফল হয়েছে। আমরা এখনই এ নীতি গ্রহণ না করতে পারলেও দুই সন্তান নীতি বাধ্যতামূলক করা জরুরি। ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুই সন্তানই যথেষ্টÑ এ রকম প্রচার ও সেøাগানের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখলেই চলবে না। এখনই আইন করে ঘোষণা করতে হবে দুই সন্তানের বেশি নেওয়া যাবে না। তিনটি নিলেই আদালতে গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরিকল্পিত পরিবার গড়তে জন্মনিয়ন্ত্রণ-সামগ্রী ব্যবহার করতে আগ্রহী, কিন্তু প্রয়োজনের সময় তা পান নাÑ এমন দম্পতির হার ১২ শতাংশ। এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত যতটুকু সাফল্য অর্জন করা গেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ সারা দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ-সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধি। এখন সরবরাহ ঘাটতির কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ-সামগ্রীর ব্যবহার হ্রাস পেলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্যের নানা ক্ষেত্রে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ-সামগ্রীর অভাব দীর্ঘায়িত হলে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের হার বেড়ে যাবে, এতে গর্ভপাত ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়বে। তাই আমাদের উচিত জন্মনিয়ন্ত্রণ-সামগ্রীর ব্যবহার আরও ব্যাপকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া। সে জন্য এসব সামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুদ ও নির্বিঘœ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা, কালক্ষেপণ বা অর্থের ঘাটতি থেকে থাকলে অবিলম্বে তা দূর করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে যা প্রয়োজন, তা হলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সরকারের আন্তরিক উপলব্ধি ও তাগিদ। অতিরিক্ত জনসংখ্যা যে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুতর একটি সমস্যা, সরকারি মহলে এই উপলব্ধির ঘাটতি আছে বলে মনে হয়। কেউ কেউ বলেন, এটা কোনো সমস্যা নয়, বরং বাড়তি জনসংখ্যা আমাদের সম্পদ। তাই পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ দিনে দিনে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে। এই কর্মসূচিকে ফলপ্রসূ করার অন্যতম প্রধান উপায় জন্মনিয়ন্ত্রণ-সামগ্রীর সহজপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও উদ্যমের অভাব দুঃখজনক।
জনঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন অত্যন্ত জটিল অবস্থায় উপনীত হয়েছে। প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় ১ হাজার ১২৫ জন মানুষের বসবাসের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে শুরু করে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবনের সব ক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে এবং সে সব সমস্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব সমস্যা আরও তীব্র রূপ ধারণ করবে। তাই আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দিকে বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সতের কোটি মানুষের যে বাড়তি চাপ, তার অভিঘাত প্রতিফলিত হচ্ছে অর্থনীতিতে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে ২ কোটি ২ লাখ লোক বেকার। এই বেকারত্বের নেপথ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটা কারণ হিসেবে কাজ করছে। একুশ শতকের দরজায় দাঁড়িয়ে তাই জনসংখ্যার ভয়াল বিস্ফোরণের লাগাম টেনে ধরা জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক : ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় বসবাসরত সাংবাদিক