জনস্বার্থ বিবেচনায় আমরা গবেষণার ফল জানিয়েছি

সম্প্রতি দুধ ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের মান পরীক্ষা করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) জানায়, তারা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান পায়নি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, মারাত্মক ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট ও সাইক্লামেট পাওয়ার কথা। এই প্রেক্ষাপটে গবেষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছেন শীর্ষ একজন সরকারি কর্মকর্তা। এসব নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক আ ব ম ফারুক।

আপনাদের গবেষণায় বাজারের সাতটি পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। এমন দুধ খেলে কী ক্ষতি হতে পারে?

আমরা কিন্তু কোনো কোম্পানির নাম বলিনি যে কার কোন পণ্য খারাপ। দ্বিতীয়ত, আমরা নমুনা সংগ্রহ করেছি কোন কোন জায়গা থেকে সেটাও বলেছি। কিন্তু ওই নমুনার মধ্যে কোনটা কোনটা ত্রুটিযুক্ত সেটা বলিনি। এটা বলিনি এ কারণে যে, শুধু শুধু তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো ক্ষতি হয় কি না এ বিবেচনায়। কিন্তু বাজারে আমাদের বক্তব্য বিকৃত করে অনেকে বলছে সব কোম্পানি খারাপ। সবার দুধ খারাপ ইত্যাদি। এখন লোকজন যার যার মতো করে টুইস্ট করে বলছে। কেউ আকর্ষণীয় করার জন্য বলছে, আবার কেউ ওই কর্র্তৃপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য বলছে। যার সব দোষ যাচ্ছে আমাদের ওপর দিয়ে। আমাদের গবেষণার স্বাস্থ্যগত দিকটা বলি, দুধে টোটাল ব্যাকটেরিয়ার কাউন্ট পাওয়া গেছে বেশি। এসব দুধ যদি কেউ ভালো করে জ¦াল দিয়ে খায় তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ওই প্যাকেট থেকে যদি সরাসরি খান, বিজ্ঞাপনে যেভাবে দেখানো হয় সেভাবে খেলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। কারণ জীবাণু সরাসরি মানুষের পেটে যাচ্ছে। কোনো কোনো কোম্পানি এভাবে সরাসরি দুধ খাওয়ানোর জন্য দুধে আরও অনেক কিছু মিশিয়ে সুস্বাদু করার চেষ্টা করে। যাতে ভোক্তা সহজে আকৃষ্ট হয়। এটা অন্যায়। এজন্য আমরা ভোক্তাদের বলছি যেন তারা প্যাকেট দুধ খাওয়ার আগে ভালো করে ফুটিয়ে পান করেন। এখন কথা হচ্ছে এ ধরনের দুধ খেলে কী হবে? এগুলো খেলে স্ট্রং ডায়রিয়া হবে, এই জীবাণুগুলোর মধ্যে এমন জীবাণুও আছে যেগুলো মানুষের মলবাহিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এতে টাইফয়েড থেকে শুরু করে জন্ডিস, হেপাটাইটিস, অন্ত্রের বিভিন্ন রকমের সংক্রমণ হতে পারে। এসব অসুখ চরমভাবে মানুষকে দুর্বল করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদিভাবে অসুস্থ করে তুলতে পারে। মানুষ মারাও যেতে পারে। ফলে সাবধান হওয়া দরকার।

দ্বিতীয়ত, পরিমাণে কম হলেও এখানে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। এতে মানব শরীরে এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের অবস্থান তৈরি হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে অসুখ হলে ওষুধ হিসেবে যদি তারা এসব অ্যান্টিবায়োটিক খায় আর সেগুলো কাজ করবে না। আমরা দুধে তিনটা অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছি, এই তিনটা অ্যান্টিবায়োটিক মানব শরীর থেকে হারিয়ে গেল। এভাবে অ্যান্টিবায়োটিক যখন শরীরে কাজ করবে না তখন আমরা সাধারণ অসুখেই মারা যেতে পারি।

 

অপাস্তুরিত দুধের নমুনায় আপনারা ফরমালিন ও ডিটারজেন্ট পেয়েছেন। এগুলো দুধে কেন দেওয়া হচ্ছে? এসব খেলে মানবস্বাস্থ্যের কী ক্ষতি হতে পারে?

প্রথমে সরকারকে ধন্যবাদ দিতে চাই এ কারণে, ২০১৫ সালে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন করায় দেশে ফরমালিনের বেপরোয়া ব্যবহার অনেক কমে এসেছে। আগে যেখানে দেশে ৭০০ টনের মতো ফরমালিন আমদানি হতো, এখন সেখানে মাত্র ১০০ টনের মতো আমদানি হচ্ছে। তার মানে প্রায় ৬০০ টন ফরমালিন মাছ, ফল, দুধ, সবজি ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা খেয়ে ফেলতাম। আমদানিকৃত এই ১০০ টন ইন্ডাস্ট্রিয়ালি ব্যবহার হয়। আগে ১০ স্যাম্পল পরীক্ষা করলে ১০টাতেই ফরমালিন পাওয়া যেত। এখন আমরা ১০টা টেস্ট করে মাত্র একটাতে পেয়েছি। তাও আবার সেটা খোলা দুধে।

দুধে ডিটারজেন্টের ব্যাপারটা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা বুঝতে পারছি না দুধে ডিটারজেন্ট বা সাবান কেন ব্যবহার করা হবে। তবে নিশ্চয়ই একটা সম্পর্ক আছে। আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি, নিশ্চয়ই একটা সময় জানতে পারব। ডিটারজেন্ট খেলে প্রথমেই মানুষের কিডনিতে সমস্যা হবে।

 

হলুদের গুঁড়োতে কাপড়ের রং মেটানিল ইয়োলো আর জুস বা পানীয়তে সোডিয়াম সাইক্লামেট (কৃত্রিম মিষ্টি) পেয়েছেন আপনারা। এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব কী ধরনের?

আমাদের দেশে ২০০৬ সালে সাইক্লামেট বাতিল করা হয়। তারপরও এগুলো কীভাবে আসে জানি না। হয়তো বা চোরাইপথে ফাঁকি দিয়ে এগুলো আসছে। এগুলোর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যায়। মূত্রথলি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আরও মুশকিল হলো বাচ্চাদের খাবারে এগুলো যেভাবে দেওয়া হচ্ছে এটা আরও ভয়ংকর ব্যাপার।

 

গরুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো, বা খাদ্যে ডিটারজেন্ট, সাইক্লামেট মেশানোর বুদ্ধি কৃষক বা ব্যবসায়ীরা পেলেন কীভাবে? এই প্রযুক্তির জ্ঞান তারা কোথায় পান বলে মনে করেন?

কৃষকের এ জ্ঞান জানার কথা নয়। এটা তারা পেয়েছে অন্যের কাছ থেকে। এখন অন্যটা কে? আমাদের পক্ষে তো আসলে বের করা মুশকিল, এই দুর্বুদ্ধিগুলো কে দেয়! অপ্রিয় হলেও সত্য, নিশ্চয় কোনো না কোনো বিজ্ঞানী এর সঙ্গে জড়িত। কারণ এটা তো বিজ্ঞান, সাধারণ মানুষের জানার কথা না। কেউ হয়তোবা টাকার বিনিময়ে এটা করেছে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ব্যাপক বিস্তৃত হয়েছে। এখন সেটা কারা করছে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এটা খুঁজে বের করা দায়িত্ব। পশুখাদ্যের যেগুলো ফিড আছে সেগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা কৃষককে মিথ্যা বলে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। যেসব ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্যে মেশানো হচ্ছে তা বাজারে পাওয়া যায় কীভাবে? এসব কি দেশে নিষিদ্ধ নয়?

ফরমালিন তো নিষিদ্ধ না। এটা ল্যাবরেটরিতে লাগে, প্লাস্টিক বানানোর কাজে লাগে, অনেক শিল্পে এর ব্যবহার আছে।

আপনারা বলছেন, জনস্বার্থের বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ গবেষণার ফল মানুষকে জানিয়েছেন। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন।

ব্যাপার হলো পাবলিক হেলথের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কোনো তথ্য যদি আপনি পান তাহলে আপনার দায়িত্ব অন্যকে সাবধান করা। এটা নৈতিক দায়িত্ব। আর আমাদের পেশাগত দিক থেকে এরকম তথ্য যদি পাই তাহলে সেটা না জানানোটা হবে অপরাধ। আমরা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। সেই কারণে আমরা জানিয়েছি। দ্বিতীয়ত, মানুষ এখন দুধ ফুটিয়ে পান করবে। তৃতীয়ত, সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ তাদের উচিত হবে এগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা। বিএসটিআই দুধের নয়টি পরীক্ষা করে। তার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নেই। তারা এটি পরীক্ষাই করে না কারণ স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে ওই মানটা নেই। তাহলে এটা এখন যোগ করে নেওয়া দরকার।