বহুমুখী গণপরিবহন ছাড়া ঢাকাবাসীর স্বস্তি মিলবে না

অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমানের জন্ম ৩০ এপ্রিল ১৯৭১, ফরিদপুরে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ থেকে তিনি ১৯৯৬ সালে বিএসসি এবং ২০০০ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি জাপানের ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করে ২০০৪ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে বুয়েটে শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে বর্তমানে পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন এবং বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বাংলাদেশ সরকারের গণপরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করা এই অধ্যাপকের গণপরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে পঞ্চাশটিরও বেশি প্রবন্ধ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার কয়েকটি প্রধান সড়ক থেকে রিকশা চলাচল বন্ধ করার পদক্ষেপ এবং ঢাকার গণপরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার নানা দিক নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন ট্রান্সপোর্ট ও ট্রাফিক সিস্টেম বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন।

দেশ রূপান্তর : রাজধানী ঢাকায় সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কন্ট্রোল অথরিটির (ডিটিসিএ) যৌথ সিদ্ধান্ত অনুসারে মিরপুর রোড বা গাবতলী থেকে আজিমপুর পর্যন্ত, সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এবং কুড়িল থেকে খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করার একটি পদক্ষেপ আমরা দেখলাম। এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মো. মিজানুর রহমান : রাজধানীর এই তিনটি প্রধান সড়কে যানবাহনের এভারেজ স্পিড বা গতি ঘণ্টায় ছয় কিলোমিটারের চেয়ে কম। এর অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে রিকশা বা অযান্ত্রিক যান চলাচল। যখন একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান একত্রে চলতে থাকে, তখন ওই সড়কের গতি অযান্ত্রিক যানের সমান বা তার চেয়ে কম হয়ে যায়। ফলে এটা বলা যায় যে, এ পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তবে, এটা একবারে না করে ধাপে ধাপে করা এবং অবশ্যই বিকল্প হিসেবে পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তা করা প্রয়োজন ছিল। তা হলে এখন রিকশাচালক এবং রিকশায় যাতায়াতকারীরা আকস্মিকভাবে যে সংকটে পড়েছেন, তা হতো না।

 

দেশ রূপান্তর : এখানে তো দুটো বিষয় রয়েছে, রিকশাচালকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকট এবং নগরের এসব সড়কে নাগরিকদের জন্য বিকল্প যান বা গণপরিবহনের সংকট।

মো. মিজানুর রহমান : রিকশাচালকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ধাপে ধাপে রিকশা কমিয়ে আনলে বা তুলে দিলে হয়তো পরিস্থিতি এমন হতো না। আর একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই কিন্তু এমন অযান্ত্রিক যান বা রিকশা নেই। এত বড় মহানগরে তো নয়ই। খেয়াল রাখা দরকার, রিকশার যে এভারেজ ট্রিপ সেটা এক-দেড় কিলোমিটারের মতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা হয়তো আরও কম। এ রকম দূরত্ব আসলে হেঁটে চলাচল করা যায়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা রাজধানী শহরেও ফুটপাতগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখতে পারছি না। ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকলে মানুষ এটুকু পথ হেঁটে একটা বাস বা অন্য গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু আমাদের এখানে পর্যাপ্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্য যাতায়াতের বাস সার্ভিসও অপ্রতুল।

 

দেশ রূপান্তর : যে প্রধান সড়কগুলোতে রিকশা বন্ধ করতে বলা হচ্ছে, সেগুলোতে রিকশার জন্য আলাদা লেন করে দিতে বলছেন রিকশা মালিক-চালকরা। এভাবে কোনো সমাধান হতে পারে কি?

মো. মিজানুর রহমান : একটি বিষয় খেয়াল করতে হবে, যে তিনটি সড়কে রিকশা বন্ধ করা হচ্ছে সেগুলো কিন্তু সব জায়গায় সমান প্রশস্ত নয়। ফলে আলাদা লেন করতে গিয়ে বাস-গাড়িসহ অন্যান্য যান্ত্রিক যানের জন্য জায়গা কমে যাওয়ার সংকট তৈরি হতে পারে। আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো, ঢাকায় রিকশার সংখ্যা আসলে কত? এর প্রকৃত পরিসংখ্যান কারও কাছেই নেই। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হিসাবে নগরীতে রিকশার সংখ্যা মাত্র ৮৭ হাজার। কিন্তু বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসের সাম্প্রতিক জরিপের তথ্যানুসারে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ১১ লাখ। এখনই অবৈধ রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি আগামীতে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

 

দেশ রূপান্তর : পরিকল্পিত নগরায়ণ না হওয়ায় রাজধানীর নানা জায়গায় এমন অনেক বড় আবাসিক অঞ্চল রয়েছেÑ যা প্রধান সড়কগুলো থেকে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং সেসব এলাকায় যাতায়াতের জন্য প্রশস্ত রাস্তাঘাট নেই। ফলে বাস বা অন্য ভালো পরিবহনও নেই। অনেক ক্ষেত্রে টেম্পো, লেগুনা, ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলে সেখানে।

মো. মিজানুর রহমান : পরিকল্পিত না হওয়াটাই প্রধান সমস্যা। ফলে রিকশা বা কম গতির অযান্ত্রিক যানগুলোকে ফিডার সার্ভিস হিসেবে এসব জায়গায় ব্যবহার করতেই হচ্ছে। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসব যানে মূল সড়কে আসবেন এবং সেখান থেকে গণপরিবহনে অন্যত্র যাবেন। এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু রিকশা তো প্রধান সড়কে এসে জায়গা দখল করছে এবং সড়কের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

 

দেশ রূপান্তর : রাজধানী ঢাকার সড়ক পরিকল্পনা বা বিন্যাস কি এক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা নয়। ঢাকার যে পরিমাণ বিস্তার ঘটেছে সে তুলনায় নানা ধরনের সড়ক কি বেড়েছে?

মো. মিজানুর রহমান : বলা হয়ে থাকে, একটা আদর্শ শহর বা নগরের আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ সড়ক নেটওয়ার্ক থাকতে হবে। আসলে এটা পৃথিবীর খুব কম শহরেই আছে। ১৫ থেকে ২০ শতাংশ থাকলেও আমরা বলি মোটামুটি আদর্শ অবস্থা। কিন্তু ঢাকার আয়তনের তুলনায় সড়ক আছে মাত্র ৮ শতাংশ। যা আছে তার ২০ শতাংশই নানাভাবে দখল হয়ে থাকায় আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। আবার এই ৮ শতাংশের পুরোটা কিন্তু প্রধান সড়ক নয়, এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকা বা পাড়া-মহল্লায় যাতায়াতের সড়ক, বাড়ির পাশের গলিপথ এসবও রয়েছে। তা ছাড়া সড়ক যতটুকু আছে সেগুলোও সার্কুলার নয় বা সব জায়গায় যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক নয়।

 

দেশ রূপান্তর : ঢাকায় গণপরিবহনের সংকট থেকে সম্প্রতি ‘রাইড শেয়ারিং’ নানা অ্যাপসের মাধ্যমে মোটরসাইকেলের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। সড়কগুলোতে তাকালেই বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল দেখা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় চলতে দেখা যাচ্ছে ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

মো. মিজানুর রহমান : মোটরসাইকেলের বিষয়টি আসলেই বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। বিআরটিএ এখন যে পরিমাণ গাড়ির নিবন্ধন দিচ্ছে তার প্রায় ৮০ শতাংশই মোটরসাইকেল। এটা অনাকাক্সিক্ষত। এর কারণে কিন্তু দুর্ঘটনার হারও অনেক বেড়ে গেছে। এটা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর অযান্ত্রিক যানকে যান্ত্রিক হিসেবে ব্যবহার করা ব্যাটারিচালিত রিকশা বা এসবকে আমরা বলি ‘নন স্ট্যান্ডার্ড ভেহিকল’। এগুলোও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ, বিশেষত মহাসড়কগুলোতে। এসব হয়তো ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু মূল সড়কে নয়। মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে রিকশা তুলে দিয়ে লাভ হবে না, কেননা তখন মোটরসাইকেল রিকশার জায়গা নিয়ে নেবে। বিআরটিএ-কে অবশ্যই এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে।

 

দেশ রূপান্তর : বলা হচ্ছে ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১ কোটি ৭০-৮০ লাখ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনের ব্যবস্থা যে খুবই অপ্রতুল সেটা সবাই বলছেন। কিন্তু এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

মো. মিজানুর রহমান : ঢাকার এত সমস্যার মূল কারণই কিন্তু অত্যধিক জনসংখ্যা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বাসাবাড়ি থেকে কর্মস্থলে বা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-হাসপাতাল বা বিভিন্ন স্থানে যে মানুষ যাতায়াত করে, এটাকে আমরা বলি ‘ট্রিপ’। এখন ৩০-৪০ লাখ শিশু-বয়স্ক মানুষ ছাড়া বাকি সবাই প্রতিদিন যে যাতায়াত করবেন, তাতে একেকজনের প্রতিদিন দুটি করে ট্রিপ ধরলেও তা প্রায় তিন কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটা আসলে ‘মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট’ বা একসঙ্গে অনেক মানুষকে পরিবহনের ব্যবস্থা ছাড়া কোনোভাবেই ম্যানেজ করা সম্ভব নয়। ‘বিআরটি’ বা বাস বেইজড এবং ‘এমআরটি’ বা রেল বেইজড ট্রান্সপোর্ট দুটোই আমাদের লাগবে। এক্ষেত্রে শুধু সারফেইসে বা মাটির ওপরে বাস বা মেট্রো হলেও হবে না; আমাদের মাটির নিচে ‘সাবওয়ে’ নেটওয়ার্কের দিকে যেতে হবে। অর্থাৎ ‘মাল্টি মোডাল ট্রান্সপোর্ট’ বা ‘বহুমুখী গণপরিবহন ব্যবস্থা’ চালু করে যানবাহনের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে যাওয়া ছাড়া ঢাকার গণপরিবহন সংকট সমাধানের কোনো পথ যেমন খোলা নেই, তেমনি সেটা না হওয়া পর্যন্ত ঢাকাবাসীর স্বস্তিও মিলবে না।

 

দেশ রূপান্তর : ঢাকা মহানগরের চারপাশে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-বালু-টঙ্গী-তুরাগ নদ মিলিয়ে প্রাকৃতিকভাবেই যে নৌপথ রয়েছে সেটাকে কেন আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। এই ‘সার্কুলার ওয়াটার ওয়ে’ বা ‘বৃত্তাকার নৌপথ’-কে ব্যবহার করা এবং একে ঢাকা মহানগরীর মূল সড়কগুলোর সঙ্গে যুক্ত করলে কি ভালো ফল পাওয়া যাবে?

মো. মিজানুর রহমান : অবশ্যই ভালো ফল পাওয়ার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা সমন্বয়ের অভাব। কেননা, আপনি ওয়াটার বাস চালু করলেন, কিন্তু ল্যান্ডিং স্টেশনে নেমে নগরের প্রধান সড়কে যাওয়ার জন্য প্রশস্ত রাস্তা বা ভালো ভেহিকেল পেলেন না, তা হলে সেই পথ ব্যবহার করবেন কেন? আরেকটি সমস্যাÑ এসব নৌপথের ওপর থাকা কয়েকটি সেতুর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স যথাযথ না থাকায় বর্ষাকালে নৌযানের চলাচল বিঘিœত হওয়ায়। এ অবস্থায় এই নৌপথগুলো নাব্য করে সেতুগুলো ঠিক করলে এবং মূল সড়কের সঙ্গে নৌপথের যোগাযোগ সমন্বয় করলে ঢাকাবাসীর যাতায়াতে নতুন মাত্রা আসতে পারে।

 

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মো. মিজানুর রহমান : আপনাকে এবং দেশ রূপান্তরের পাঠকদেরও অনেক ধন্যবাদ।