আশ্রয়কেন্দ্রে পানিবাহিত রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা

টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে প্লাবিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ। ভারী বর্ষণে বান্দরবান ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে নিহত হয়েছেন চারজন। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে নিখোঁজ হয়েছেন এক যুবক। লালমনিরহাটে ঝড়ে গাছের ডাল পড়ে নিহত হয়েছেন এক গৃহবধূ।

সারা দেশে জলাবদ্ধতা আর বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণের খাবাব-দাবারে দিন কাটছে তাদের। কোনো কোনো এলাকায় দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ সংক্রমণেরও আশঙ্কা।

এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টি কমবে। পানি নেমে যেতে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বন্যা স্থায়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ১৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ডিমলায়।         

 

সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতি : দেশের সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত জেলা লালমনিরহাটের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্ণা, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ও সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ও রাজপুর ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। ছয় দিন ধরে পানিবন্দি থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে নানা পানিবাহিত রোগ। বন্যাদুর্গত এলাকায় মেডিকেল টিম কাজ করছে বলে জানান জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবুল কাশেম।

এদিকে গত শনিবার রাতে পাটগ্রামের বুড়িমারী ইউনিয়নে ঝড়ে গাছের ডাল পড়ে মারা যান আলেমা বেগম (৪৫) নামে এক গৃহবধূ।

সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ছয়টি উপজেলা প্লাবিত হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে মানুষ ঝুঁকি নিয়েই পান করছেন দূষিত পানি। এতে করে পানিবাহিতসহ নানা রোগের আশঙ্কা করছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, পানি বিশুদ্ধ করার জন্য বন্যাকবলিত এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ ৩০ হাজার ট্যাবলেট বিতরণ করা হবে। এছাড়া যেসব টিউবওয়েল ডুবে গেছে সেগুলো বন্যার পানি নেমে গেলে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ধোয়া হবে। বন্যার কারণে জেলার ২১৮টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখনো বন্ধ রয়েছে। উঁচু স্থানের বিদ্যালয়গুলো পানিবন্দি মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খোলা রাখা হয়েছে।

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদসহ তিস্তা ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বন্যাকবলিত সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ৯৫টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ৬৩টি। জেলায় ২৪০ মেট্রিক টন চাল, নগদ দুই লাখ টাকা, দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কুড়িগ্রামে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে এর অববাহিকার প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নদীভাঙনে গৃহহীন হয়েছে ৭২৫টি পরিবার। জেলার নয় বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোয় ৫০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নীলফামারীতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অববাহিকার মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। এলাকায় কিছু শুকনা খাবার বিতরণ করা হলেও অনেকের ভাগ্যে তা জোটেনি।

বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহত হয়েছেন দুজন। গত শনিবার বিকেলে চিম্বুক পোড়াপাড়ার জুমচাষি মেনপং ম্রো (২৫) এবং একই দিন রাতে লামা সদরের মধুঝিরি এলাকার গৃহিণী নূরজাহান বেগম (৬৫) পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে মারা যান। মধুঝিরি এলাকায় পাহাড় ধসে আহত হয়েছেন দুজন। সদরসহ জেলার চারটি উপজেলার এলাকায় পানীয় জলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাহাড় ধসে আনোয়ার সাদেক (৩৫) ও ওয়ারেসা বেগম (৩০) নামের দুজন নিহত হয়েছেন। গত শনিবার রাত ৩টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বমুরকুল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানির স্রোতে রাস্তা পারাপারের সময় মোহাম্মদ রাজু (২৬) নামে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছেন।