কুমিল্লায় বিচারকের কক্ষে ছুরি মেরে খুনের আলোচিত ঘটনায় মামলা করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফারুককে হত্যার উদ্দেশ্যে সঙ্গে ছুরি নিয়ে আসেন ‘ঘাতক’ হাসান। সকাল থেকেই আদালতের সামনে ছুরি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর দেখামাত্রই ফারুকের ওপর ঝাপিয়ে পড়েন তিনি। গ্রেপ্তারের পর হাসান এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে জানান কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।
২০১৩ সালে মনোহরগঞ্জ থানায় করা একটি হত্যা মামলার শুনানিকালে গত সোমবার কুমিল্লার অতিরিক্ত তৃতীয় দায়রা জজ ফাতেমা ফেরদৌসের আদালতে এ হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহত মোহাম্মদ ফারুক (৩০) ও আঘাতকারী মোহাম্মদ হাসান (২৫) নিয়মিত হাজিরা দিতে এসেছিলেন। ফারুক সম্পর্কে হাসানের ফুফাত ভাই। এদিকে এ ঘটনায় কারও গাফিলতি থাকলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, দেশের সব আদালতে নিরাপত্তা বাড়ানো হবে।
এ হত্যার ঘটনায় ‘ঘাতক’ হাসানকে আসামি করে সোমবার গভীর রাতে মামলা করেন প্রত্যক্ষদর্শী বাঙ্গরা থানার এএসআই ফিরোজ আহাম্মেদ। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক প্রদীপ কুমারকে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পরিদর্শক (তদন্ত) সালাউদ্দিন বলেন, ‘হাসানের দাবি, ফারুকের কারণেই তাকে আ. করিম হত্যা মামলার আসামি হতে হয়েছে। তিনি ওই ঘটনার কিছুই জানেন না। আসামি হওয়ার পর থেকেই হত্যার উদ্দেশ্যে হাসান ফারুককে খুঁজছিলেন, কিন্তু নাগালে পাননি। সোমবার আদালতে দেখে এজলাস থেকে খাস কামরা পর্যন্ত উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন।’ এজন্য বাড়িতে থাকা একটি পুরনো ছুরি ধার দিয়ে আদালতে নিয়ে আসেন বলেও জানায় পুলিশ।
গতকাল মঙ্গলবার দেখা যায়, কুমিল্লা আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আদালতে প্রবেশকারীদের প্রতিটি ফটকে তল্লাশি করা হচ্ছে। হত্যার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তদন্ত কমিটির সদস্য পুলিশ সুপার শাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত এ হত্যার তদন্ত শেষ করা হবে। পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কি না সেটিসহ সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।’ গতকাল প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয় বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় আদালতের পুলিশ পরিদর্শক সুব্রত ব্যানার্জির বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। ছয় বছর কর্মরত এ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা। ঘটনার সময় এজলাসের সামনে পুলিশ থাকলেও নিরস্ত্র থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে দাবি আদালত পরিদর্শকের। এ বিষয়ে আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাহমিদা জেবিন বলেন, ‘আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটা দুর্বল, পুলিশ সদস্যদের তেমন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না।’ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সৈয়দ আব্দুল্লাহ পিন্টু বলেন, ‘আদালতের এজলাসে হত্যাকা- একেবারেই বিরল, এ নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি।’ তিনি আদালতপাড়ায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি জানান।
‘কারও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা’ : কুমিল্লা আদালতে আসামি খুনের ঘটনায় কারও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল রাজধানীতে বিজিবি সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এজলাস কক্ষে এমন ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। এ রকম জায়গায় কীভাবে একজন মানুষ ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসতে পারে, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এতে নিরাপত্তাগত দিক থেকে যদি কারও গাফিলতি থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
‘সব আদালতের নিরাপত্তা বাড়বে’ : গতকাল জেলা প্রশাসক সম্মেলন উপলক্ষে সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের কার্যঅধিবেশন শেষে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কুমিল্লার এসপির সঙ্গে কথা বলে আদালতের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে বলেছি। তবে শুধু কুমিল্লার আদালত নয়, ৬৪ জেলার সব আদালতের নিরাপত্তা বাড়ানো হবে।’