দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির পর এবার মধ্যাঞ্চলে বন্যার পানি আসতে শুরু করেছে। গতকাল বুধবার সকালে ফরিদপুরের গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি বেড়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া শুরু হয়। পদ্মা ও যমুনা নদীতে বন্যার পানির প্রবল স্রোতে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া এবং মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি পর্যন্ত নৌপথে বেশ কিছু ফেরি বন্ধের কারণে দুই পাড়ে যানবাহনের জট দেখা গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। এদিকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর বেড়েছে। পানির চাপ সামলাতে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্র্তৃপক্ষ গত মঙ্গলবার রাত থেকে স্পিলওয়ের ১৬টি গেটই খুলে দিয়েছে। অন্যদিকে কিছু কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, যেগুলোতে বিপুল সম্পদহানি হয়েছে; দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও পশু খাদ্যের তীব্র সংকট। জামালপুরের ইসলামপুরে বন্যার পানিতে ডুবে সজিব মিয়া (১০) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকালের তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা নদীর উপরিভাগ ও দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি এলাকা ছাড়া দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল বাড়ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উজানের জেলাগুলোতে আগামী ৪৮ ঘণ্টা অর্থাৎ আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের শঙ্কা নেই। তবে এই সময়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি আজ বৃহস্পতিবার পদ্মা নদী ভাগ্যকুল পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এছাড়া আজ কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। একই সময় নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
ফরিদপুর জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁ, মধুমতি, কুমারে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, জেলা সদর, চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পদ্মার পানি প্রবেশ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে দুই-এক দিনের মধ্যে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যমুনা ও পদ্মা নদীতে বন্যার পানির প্রবল স্রোতের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌপথে বেশ কিছু ফেরি বন্ধের কারণে যানবাহনের জট দেখা দিয়েছে নদীগুলোর দুই পাড়ে। হাজারো পরিবহন আটকে থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। নষ্ট হচ্ছে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর কাঁচামাল। আটকে পড়া পরিবহনের সংখ্যা বাড়ছে।
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্র্তৃপক্ষ স্পিলওয়ের ১৬টি গেট খুলে দেওয়ায় প্রতি সেকেন্ডে ২৭ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। পানি ছাড়ার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সেকেন্ডে আরও ২৪ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। এতে কাপ্তাই, রাঙ্গুনিয়ার নিম্নাঞ্চলের অনেক জায়গা তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এ টি এম আব্দুজ্জাহের জানান, অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি বৃদ্ধিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বেড়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রের ৪টি ইউনিটে ১৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ১৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদ অববাহিকা ছাড়াও লোকালয়ের উঁচু স্থানগুলোর বাড়িঘরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। সাড়ে ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, এসব মানুষের মধ্যে একদিনের জন্য মাথাপিছু ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ১ কেজি ১১ গ্রাম চাল ও এক প্যাকেট করে শুকনা খাবার। তবে সরকারি হিসাব অনুয়ায়ী, বানভাসিদের সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৯ জন। তাদের হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে ৫০০ মেট্রিক টন চাল। সেই বরাদ্দ দেওয়া চাল এখনো অনেক ইউনিয়নে বিতরণ শেষ হয়নি বলে খবর পাওয়া গেছে।
তিস্তার বন্যায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় কৃষিতে ২৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। তবে জলঢাকা উপজেলায় বন্যাকবলিত ইউনিয়নগুলোতে ফসলের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছে কৃষি দপ্তর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তিস্তার বন্যায় জেলার ডিমলা উপজেলায় ১ হাজার ৫৭৫ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব কৃষকের বীজতলাসহ ২২৫ বিঘা জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ২৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
যমুনা নদীর পানির চাপে গতকাল গাইবান্ধা-সাঘাটা উপজেলা সড়কের সাঘাটার পোড়াগ্রাম এলাকায় পাকা রাস্তা এবং ঘাঘট নদীর পানির চাপে সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের কাজলঢোপ এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গেছে। ত্রিমোহনী থেকে বাদিয়াখালী পর্যন্ত রেললাইন বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় এ পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া গাইবান্ধা জেলা শহরে বন্যার পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে ডিসি, এসপি ও জেলা জজের বাসভবন।
জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে চার লক্ষাধিক মানুষ। গতকাল ইসলামপুর উপজেলা সদরে পঁচাবহুলা গ্রামে বাবার সঙ্গে বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে গোসল করতে গিয়ে সজিব নামে শিশুটির মৃত্যু হয়। দুপুরে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হয়েছে। জেলার সাত উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫২টি বন্যাকবলিত হয়েছে। রেললাইনে পানি ওঠায় বন্ধ হয়ে গেছে মেলান্দহ-ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল। ২৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ৫ হাজার ৭২০ জন মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে ৫৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান। তলিয়ে গেছে অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও গো-খাদ্যের সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা নায়েব আলী জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, সাড়ে ৯ লাখ টাকা ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। উঁচু সড়কে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বন্যার্তদের জন্য ৫০০ তাঁবু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।