পাসের হারের সঙ্গে প্রয়োজন শিক্ষার মান

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার পাস করেছে ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। জিপিএ ৫ পেয়েছে মোট ৪৭ হাজার ২৮৬ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ; জিপিএ ৫ পেয়েছিল ২৯ হাজার ২৬২ জন। সে হিসেবে এবার উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার বেড়েছে ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ১৮ হাজার ২৪ জন। পাশাপাশি খারাপ খবর হলোÑ এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৪১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে ৯০৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থীই পাস করেছে।

 

এবার পাসের হার বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ইংরেজি পরীক্ষায় আগের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভালো ফল করেছে। ঢাকা বাদে বাকি সাত শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে গড় পাসের হার ৯১ থেকে ৯৬ শতাংশের বেশি, গতবার এ হার ছিল ৬৫ থেকে ৮২ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে গতবার ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৭৫ শতাংশ, এবার বেড়ে ৭৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতে, গতবার ইংরেজির প্রশ্নপত্র কঠিন হয়েছিল। এবার ইংরেজির প্রশ্নপত্র সহজ করা হয়েছে। পাসের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি এবং বোর্ডভিত্তিক আলাদা প্রশ্নপত্র প্রণয়নও অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

সম্প্রতি পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা অনেকটা কমেছে; একইসঙ্গে আরও একটি স্বস্তিদায়ক বিষয় হলোÑ প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো অভিযোগ এবার শোনা যায়নি। তবে অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও নোট-গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হয়নি। শিক্ষাক্ষেত্রে এসবের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানের ফল খারাপ হচ্ছে, সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

 

পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক। তবে শিক্ষার মান আমরা কতটা বাড়াতে পেরেছি, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। পাসের হার ও জিপিএ ৫ এর সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়েও বেশি জরুরি হলো শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা। আমাদের পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো রেজাল্টধারী তৈরির ওপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মেধা ও দক্ষতা বিকাশের ওপর নয়। এর পেছনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষাক্ষেত্রে পাসের হার বৃদ্ধি ও জিপিএ ৫ বাড়ার কৃতিত্ব নেওয়ার প্রবণতা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী অভিভাবকদের ভালো ফলের প্রত্যাশা ও প্রতিযোগিতা। কেবল বেশি নম্বর আর ভালো ফলই নয়, শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে, জীবন সম্পর্কে তাদের বোধ কতটুকু তৈরি হচ্ছে, তারা কতটা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে সেটা নিশ্চিত করা শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। 

 

এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন শিক্ষকরা। কিন্তু দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। মেধাবীরা এই পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছেন না। মেধাবী ও উদ্যমী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো প্রয়োজন। 

 

স্কুল-কলেজে পাঠদানের সীমাবদ্ধতা এবং পাঠ্য বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের ভালো দখল না থাকার বিষয়টি সামনে চলে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময়। তুমুল প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক বিষয়গুলোতে পাসই করতে পারে না। শুধু ভর্তি পরীক্ষা নয়, শিক্ষা গ্রহণের পরবর্তী ধাপগুলোতে পদে পদে ঠেকতে হয় বুনিয়াদি শিক্ষার দুর্বলতার কারণে। শিক্ষার সার্বিক মান বাড়াতে প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা ও প্রযুক্তির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।