ধারাবাহিক নাটকে হুমায়ূনের স্বর্ণযুগ

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরেই দেশের ধারাবাহিক নাটকের পালে হাওয়া লেগেছিল। তার ‘এইসব দিনরাত্রি’,

‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’, ‘আজ রবিবার’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’, ‘এই মেঘ এই রৌদ্র’ নাটকগুলোকেই ধারাবাহিকের স্বর্ণযুগ বলা হয়। বিটিভিতে এসব নাটক দেখার জন্য দর্শক পুরো সপ্তাহ অপেক্ষায় থাকত। আর এখন দেশি ধারাবাহিক বাদ দিয়ে দর্শক ভারতীয়, টার্কিশ, ইংরেজি ও চীনা ধারাবাহিক দেখছে। হুমায়ূন আহমেদের ধারাবাহিকে কী ছিল যা এখন নেই বলে ধারাবাহিক নাটক দর্শক হারাচ্ছেÑ এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন কয়েকজন গুণী শিল্পী

 

 

অতিমাত্রায় টিভি চ্যানেল, নাটকের বাজেট হ্রাস দায়ী

আলী যাকের

আসলে গল্পই হচ্ছে যেকোনো ভিজ্যুয়াল ওয়ার্কের প্রাণ। হুমায়ূন আহমেদের ধারাবাহিকে এত বৈচিত্র্যময় গল্প আমরা তুলে ধরেছি, যা তখনকার দর্শকের জন্য কিছু একেবারেই ফ্রেশ। নতুনকে মানুষ সব সময় ভালোবাসে। তাই তখন সেগুলো ব্যাপকভাবে দর্শক গ্রহণ করেছিল। তাছাড়া এখন অতিমাত্রায় টিভি চ্যানেল, অতিরিক্ত নাটক নির্মাণ, নাটকের বাজেট হ্রাসসহ অনেক কারণে নির্মাণ আর অভিনয়, দুইয়ের মানই কমেছে। নাটকীয়তা আর অভিনয়ে গভীরতা কমে গেছে। নাটক হয়ে গেছে শুধুই কমেডি ও প্রেমকেন্দ্রিক। নতুনদের মেধা আছে, কিন্তু কাজে লাগানোর মতো সুযোগ তাদের দেওয়া হচ্ছে না। এসব কারণেই দর্শক এখনকার ধারাবাহিকগুলো দেখছে না।

 

হুমায়ূন আহমেদ চরিত্র তৈরির ওস্তাদ

সুবর্ণা মুস্তাফা

সৃষ্টিশীল মানুষের কথায়, ‘হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে আছেন; বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে।’ নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতার গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্রের অসংখ্য চরিত্র মানুষের মনে আঁচড় কেটেছে। দশকের পর দশক সে চরিত্রগুলোর আবেদন মøান হয়নি। আসলে হুমায়ূন আহমেদ চরিত্র তৈরির ওস্তাদ ছিলেন। সেই নাটক বা চলচ্চিত্র বেশিদিন বেঁচে থাকে যার চরিত্রগুলো খুবই জোরালো। আর একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে তো আমরা সব সময় একটি ভালো চরিত্র খুঁজি যাতে প্রাণ ঢেলে কাজ করতে পারি। এই চরিত্র সৃষ্টির গুণাবলি এখনকার নাট্যকার-নির্দেশকের মধ্যে আমি খুব মিস করি। আমি যেহেতু এখনো নিয়মিত অভিনয় করছি, ফলে আমি এই অসুবিধায় বেশি পড়ি। তখন হুমায়ূন আহমেদকে খুব মিস করি। তার যে চরিত্রগুলোয় আমি অভিনয় করেছি, তার মধ্যে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের মুনা চরিত্রটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অভিনয়ের জন্য মুনা অসাধারণ এক চরিত্র। মনে আছে, এ নাটকের ‘বাকের ভাই’ নিয়ে চারদিকে যখন তুমুল আলোচনা, তখন হুমায়ূন আহমেদের প্রশ্ন ছিল, বাকেরকে নিয়ে এত হইচই কেন? ট্র্যাজেডি তো মুনার। চরিত্রটি সত্যিকার অর্থেই মাল্টিডাইমেনশনাল। অনেক শিল্পী এ ধরনের একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রতীক্ষায় থাকেন। আমি ভাগ্যবান যে, আমাকে মুনা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রতীক্ষায় থাকতে হয়নি।

 

সমাজ বাস্তবতার দর্পণ ছিলেন হুমায়ূন

ড. ইনামুল হক

হুমায়ূন আহমেদের নাটক কেন জনপ্রিয়তা পেয়েছে তা হিসাব করতে রকেট সায়েন্স জানার দরকার নেই! যেকোনো দর্শকই বুঝবেন তার নাটকে আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে দেখানো হতো। সমাজ বাস্তবতার দর্পণ ছিলেন হুমায়ূন। কিন্তু এখন নাটক নির্দিষ্ট ছকে বন্দি হয়ে গেছে। অশিক্ষিত লোকজন এত বেশি বেড়ে গেছে যে তারা যা বানাচ্ছে তা হয়ে যাচ্ছে ভাঁড়ামি। এসব দেখে খুব দুঃখ হয়। নতুন প্রজন্মের উচিত পড়াশোনা করে সংস্কৃতি চর্চা করা। তাহলে তারা নতুন নতুন চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কাজ করতে পারবে। 

 

নতুনদের অভিনয় দক্ষতার বড়ই অভাব

আবুল হায়াত

শুধু ধারাবাহিক কেন, এখনকার পুরো নাটকের অবস্থা নিয়েই আমি হতাশ। ধারাবাহিক হচ্ছে দুই ধরনের। হয় কমেডি, নয়তো ক্রাইম থ্রিলার। আর খ- নাটকে তরুণ-তরুণীর প্রেম দেখানো হচ্ছে। এসব নাটক ভাঁড়ামি ও দুই-তিন জন শিল্পীনির্ভর। আর গল্প ছাড়াই নাটক হচ্ছে। তবে দক্ষ অভিনয়শিল্পীরা অনেক সময় একটা নিম্নমানের চিত্রনাট্যকেও দারুণভাবে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু নতুনদের অভিনয় দক্ষতার বড়ই অভাব! ফলে তারা মেধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের উচিত তারকাখ্যাতি বা অর্থ উপার্জনের চেয়ে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা।