রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন মিন্নি!

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনের। গতকাল বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তার দেখানোর আগে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ডে নেওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে মিন্নি এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।’

তবে গত মঙ্গলবার সকালে রিফাত হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী মিন্নিকে প্রথমে জবানবন্দির জন্য এনে রাতেই গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। পরের দিন তাকে আদালতে নেওয়া হলে মিন্নি আদালতকে বলেছিলেন, ‘রিফাত শরীফ আমার স্বামী। আমি আমার স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িত না। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই। আমি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না। আমাকে ষড়যন্ত্র করে এই মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।’

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার         

 

 আরও বলেন, ‘মিন্নি শুরু থেকেই যারা হত্যাকারী ছিল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। সে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার অংশ ছিল। এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার আগে সে এই হত্যাকাণ্ডটির পরিকল্পনার জন্য যা যা দরকার তার সবকিছুই করেছে। হত্যা পরিকল্পনার মিটিংও করেছে হত্যাকারীদের সঙ্গে।’

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মিন্নি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকার করেছেন কি না জানতে চাইলে মারুফ হোসেন বলেন, ‘হ্যাঁ, মিন্নি আমাদের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। আমাদের কাছেও প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, মিন্নি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মিন্নি স্বীকার করেছে বলেই আমরা এ বিষয়গুলো আদালতের কাছে তুলে ধরে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আদালতের কাছে রিমান্ড আবেদন করেছি। আদালতের বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।’

এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘এই মামলার বাদী যাদের হত্যাকারী বলে দাবি করেছেন, আমরা কিন্তু রাতদিন জেগে থেকে তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করেছি। বাকিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

রিফাত হত্যা মামলার ১০ আসামির এরই মধ্যে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মিন্নি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এমন কোনো তথ্য উঠে এসেছে কি না প্রশ্নের উত্তরে মারুফ হোসেন বলেন, ‘আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। তবে একটা বিষয় বলতে চাই, আদালতে যারা জবানবন্দি দিয়েছে তাদের মধ্যে থেকে একাধিক আসামি আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মিন্নির জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।’

মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তার শ্বশুর আবদুল হালিম দুলাল শরীফ সংবাদ সম্মেলন করার পরপরই মিন্নিকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘যোগসূত্র থাকা বা না থাকার বিষয়টির আসলে আইনের কাছে গুরুত্ব নেই। তদন্ত স্বচ্ছ এবং সাবলীল প্রক্রিয়া মাত্র। তদন্তের ক্ষেত্রে যে যে বিষয়গুলো সামনে আসে হত্যাকাণ্ডটি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেসব বিষয় নিয়েই কাজ করেছি। শুধু আমি না, আপনারা দেখেছেন ডিআইজি মহোদয়ও বেশ কিছুদিন এখানে অবস্থান করেছিলেন।’

এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘প্রেস কনফারেন্স ও মানববন্ধন যা আমাদের তদন্তের সঙ্গে সংঘর্ষিক সে বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে আমরা আমাদের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই বা অন্য কোনো মহলেরও চাপ নেই।’

গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের সড়কে বহু পথচারীর সামনে রিফাতকে প্রকাশ্য কুপিয়ে হত্যার সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির প্রচেষ্টার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। পরদিন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। ওই মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। কিন্তু গত শনিবার বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পুত্রবধূ মিন্নির বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন দুলাল শরীফ। পরদিন রবিবার মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়। ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত ওই মানববন্ধনে অংশ নেন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ। মানববন্ধনে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ বক্তব্য দেন। রিফাত হত্যার পরপরই তার খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী হিসেবে যে দুজনের নাম আলোচনায় এসেছিল তার একজন এই সুনাম দেবনাথ। যদিও সুনাম তা অস্বীকার করে আসছেন।

আর দুলাল শরীফের সংবাদ সম্মেলন এবং মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ওই মানববন্ধন কর্মসূচির পরপরই রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ভিন্নদিকে মোড় নেয়। এরপর মঙ্গলবার সকালে রিফাত হত্যা মামলার এক আসামিকে শনাক্ত এবং জবানবন্দি নেওয়ার কথা বলে মিন্নিকে নেওয়া হয় বরগুনার পুলিশ লাইনসে। সেখানে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৯টায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানান পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন। পরে বুধবার মিন্নিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মিন্নিকে পুলিশ যেভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে, তা নিয়ে বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতেও আলোচনা হয়। এর পেছনে প্রভাবশালী কারও প্ররোচনা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন একজন সংসদ সদস্য। এছাড়া মিন্নিকে বুধবার আদালতে হাজির করার পর তার পক্ষে কোনো আইনজীবীর না দাঁড়ানো নিয়েও দেশব্যাপী আলোচনা চলছে। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন, তিনি তিনজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের দাঁড়ানোর কথাও ছিল, কিন্তু তারা শুনানিতে অংশ নেননি। ওই তিন আইনজীবী শুনানিতে না দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে ওকালতনামায় সই না হওয়ার কথা বললেও মিন্নির বাবার সন্দেহ, ‘প্রতিপক্ষের ভয়েই’ আইনজীবীরা তার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন না।