ডেঙ্গুর সব তথ্য আসছে না সরকারি তালিকায়

ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্তের পাশাপাশি এতে মৃত্যুর সংখ্যা রীতিমতো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হচ্ছেন। ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর বাইরেও। অথচ ডেঙ্গুর বিস্তার, রোগী ও এতে মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান মিলছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুর সঠিক পরিসংখ্যান না এলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।

এ ব্যাপারে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর-বি) কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচিত ডেঙ্গুর সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা ও তা প্রচার করা। তা না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক কী ধরনের ভূমিকা রাখছে ও ডেঙ্গুর সার্বিক পরিস্থিতি কী, তা বোঝা যাবে না। অবহেলা করলে একসময় ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। গত কয়েক দিন ধরেই ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সরকারের মন্ত্রীরাও। গত বৃহস্পতিবার মশার কামড়ের ভয়ে এখন থেকে সচিবালয়ে অফিস করবেন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থমন্ত্রী বলেন, একবার তিনি চিকুনগুনিয়া ও আরেকবার ডেঙ্গুজ্বরে ভুগেছেন। এরপর থেকে মশার ভয়ে আগারগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে যেতে ভয় পাচ্ছেন। একইভাবে গতকাল শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশা সম্পর্কে নগরবাসীকে সচেতন করতে র‌্যালির আগে তিনি মন্তব্য করেন, ২০০০ সালের প্রথম দিক থেকেই এ রোগের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। গেল বছরের আগ পর্যন্ত এটি নিয়ে আমরা তেমন একটা চিন্তিত ছিলাম না। কিন্তু এবার চিন্তার বিষয় আছে। আর তাই এই এডিস মশা নিধনে সরকারের সব প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

আক্রান্তের সব তথ্য আসছে না : সরকারি হিসেবেই গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই পর্যন্ত  সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৫৪৬ জন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছিল ৩ হাজার ৫৩২ জন। অথচ গত বছর এ মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে ৯শ। এমনকি গত এক মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। গত ১৮ জুন যেখানে আক্রান্ত হয়েছিল ৭৫ জন, সেখানে গত ১৭ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয় ২৪৬ জন। এর আগে ১৫ জুন ছিল সর্বোচ্চ ২৯৯ জন। এর আগে গত মে মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৮৪ জন। ঢাকার বাইরে অন্তত চারটি জেলায় ডেঙ্গুজ্বরের রোগী শনাক্ত হয়েছে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সব তথ্য কন্ট্রোল রুমে আসছে না বলে স্বীকার করেছেন হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সার্ভিসেস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছোট হাসপাতালগুলোর কথা কী বলব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত ডেঙ্গুর তথ্য পাঠায় না। অনেক বলার পর দু’তিন দিন আগে গ্রীন রোডের গ্রীন লাইফ হাসপাতাল অপূর্ণাঙ্গ একটি তালিকা পাঠিয়েছে। সেন্ট্রাল হাসপাতাল তথ্য দেয় ঠিকই, কিন্তু আমাদের ফোন করে আনতে হয়। এসব হাসপাতাল তথ্য দিতে বাধ্য।

এই সহকারী পরিচালক আরও বলেন, গত বছর ২২টি হাসপাতাল তথ্য দিত। এবার ৩৫টি দিচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে আরও অসংখ্য হাসপাতাল তথ্য দেয় না। ফলে ডেঙ্গুরোগীর সঠিক তথ্য আমরাও দিতে পারছি না। অথচ এসব হাসপাতালকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেউই সরকারি আদেশ মানছে না।

মৃত্যুর তথ্যে গরমিল : ডেঙ্গুতে এ বছর ঠিক কী পরিমাণ রোগী মারা যাচ্ছে, এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারের কাছে। বুধবার পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন পাঁচজন। এর মধ্যে এপ্রিলে দুজন, জুনে দুজন ও এ মাসে একজন রয়েছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নমুনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগ সংগ্রহ করেছে, পরীক্ষা শেষে তাদের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু হলে এই সংখ্যা জানানো হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২৯ এপ্রিল বিআরবি হাসপাতালে ৫৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি এবং আজগর আলী হাসপাতালে ৩২ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যু হয় ডেঙ্গুতে। এরপর ১৬ জুন অ্যাপোলো হাসপাতালে মারা যায় ১১ বছরের এক শিশু, ২৯ জুন ইবনে সিনা হাসপাতালে ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি এবং ৩ জুলাই স্কয়ার হাসপাতালে ৪২ বছর বয়সী এক চিকিৎসকের মৃত্যু হয়।

২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। সরকারি হিসাবে ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়েছিল ও মারা গিয়েছিল ৯৩ জন। গত বছর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মারা যায় ২৬ জন। এ বছর গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫।

তবে হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৯-২২ জনের মৃত্যুর খবর তারা পেয়েছে। বিভিন্ন সময় কন্ট্রোল রুমে ফোন করে এসব তথ্য জানালেও তারা অফিশিয়ালি তথ্য-উপাত্ত জমা দিয়েছে কি না তা জানা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের ডেথ রিভিউ কমিটির কাছে বেশকিছু মৃত্যুর খবর এসেছে। সেগুলো যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজন, মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে দুজন, স্কয়ার হাসপাতালে তিনজন, ল্যাবএইড হাসপাতালে একজন এবং পুরান ঢাকার সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে হলি-ফ্যামিলি হাসপাতালে আরও তিন শিশুর মৃত্যু খবর পেলেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য-উপাত্ত তাদের কাছে নেই।

গত ১৫ জুলাই স্কয়ার হাসপাতালে মারা গেছে লাবণ্য আলিনা কাজী নামে চার বছরের এক শিশু। আলিনার বাবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ কাজী ফয়সাল জানান, ১০ জুলাই আলিনাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডেঙ্গুর কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবিনা নামে এক রোগী ডেঙ্গুতে মারা গেলেও এসব তথ্য পায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এ ছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত দুজনের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর কন্ট্রোল রুম পেয়েছে। এর মধ্যে ১২ জুলাই জায়েদা বেগম নামে ৪৫ বছরের এক গৃহিণীর মৃত্যু হয়। আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা জায়েদা ১১ জুলাই এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে’র কথা বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালসহ নানাজন ফোন করে আমাদের এখন পর্যন্ত ১৯-২২ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে। আমরা সেগুলো আইইডিসিআরকে জানাই। সেখানে ডেথ রিভিউ কমিটি আছে। যাচাই-বাছাই করে আমাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য দিলে তবেই আমরা প্রচার করি।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান,  যত মারা যায়, আমরা প্রায় সবই সংগ্রহ করি। ডাক্তার, রোগীর আত্মীয়স্বজন সবার সঙ্গে কথা বলি। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু নিশ্চিত হলেই সংখ্যা প্রকাশ করি। এ জন্য সংখ্যায় গরমিল হতে পারে। আমাদের একটা ডেথ রিভিউ কমিটি আছে। তারা সব তথ্য পাওয়ার পর যদি নিশ্চিত হয় যে ডেঙ্গু, তবে সেটা আমরা রিপোর্টে দেখাই। সুতরাং ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা লুকানোর কিছু নেই।