বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা নামের এক বাংলাদেশি নারী যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন তা প্রায় সবার কাছে অনাকাক্সিক্ষত বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী ‘ধর্মীয় স্বাধীনতায় অগ্রগতি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত বুধবার হোয়াইট হাউসে গিয়ে প্রিয়া সাহা প্রেডিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেনÑ বাংলাদেশ থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ৩ কোটি ৭০ লাখ লোক নিখোঁজ হয়েছেন। প্রিয়া এ কথাও বলেন যে, মুসলিম মৌলবাদীরা তার জমি দখল করে নিয়েছে এবং তার কোনো বিচার তিনি পাননি। প্রিয়া আরও বলেন, এখনো বাংলাদেশে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু মানুষ থাকে। তাদের যাতে দেশ ছেড়ে যেতে না হয় সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাহায্য প্রার্থনা করেন তিনি। সংগত কারণেই প্রিয়ার এসব বক্তব্য নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
শনিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘বাংলাদেশ সরকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার এই ভয়ংকর মিথ্যা অভিযোগের কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং তার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।’ কড়া ভাষায় প্রিয়া সাহার বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রিয়া সাহার এই চরম মিথ্যাচার এবং সাজানো গল্পের পেছনে অশুভ উদ্দেশ্য রয়েছে। তার এই বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা। এর আগে শুক্রবার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে এক অনুষ্ঠান শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন, তা একেবারেই মিথ্যা। বিশেষ মতলবে এমন উদ্ভট কথা বলেছেন তিনি। আমি এমন আচরণের নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহার বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘এ বক্তব্য শুধু নিন্দনীয় অপরাধ নয়, সাম্প্রদায়িক শক্তির জন্য উসকানিমূলক। দেশদ্রোহী এ বক্তব্যের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এর প্রক্রিয়া চলছে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘এ ধরনের খবর দেওয়ার পেছনে তার নিশ্চয়ই একটি কারণ ও উদ্দেশ্য রয়েছে। দেশে এলে নিশ্চয়ই আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করব।’ এদিকে, বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, তাদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের যে অভিযোগ করেছেন তা একান্তই তার নিজস্ব বক্তব্য, সংগঠনের নয়।
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে প্রিয়া সাহা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা যেমন অনাকাক্সিক্ষত ও শিষ্টাচার বহির্ভূত তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো। অবশ্য প্রিয়ার এই উদ্ধত মিথ্যাচার যে কোনোভাবেই ধোপে টিকবে না তা বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকেও স্পষ্ট হয়েছে। শুক্রবার রাজধানী ঢাকায় রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশি নারী প্রিয়া সাহা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সঠিক নয়। এ সময় বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত। এদিকে, প্রিয়ার অভিযোগের অসারতা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রে বলেছেনÑ বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের ২৫ শতাংশ হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যদিও তারা মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ। সামাজিক পরিসরেও এ ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া টের পাওয়া যায় প্রিয়ার বক্তব্যকে চক্রান্ত ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে প্রিয়াকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আইনজীবীদের মামলা করার প্রস্তুতির ঘোষণায়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রদায়িকতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তা কাজে লাগিয়ে কেউ যাতে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার সুযোগ না পায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রিয়া তার বক্তব্যে যেভাবে দেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের দায় একতরফাভাবে মুসলিম মৌলবাদীদের ওপর চাপিয়েছেন, তাতে যেমন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রকাশ পায়; তেমনি প্রিয়ার বক্তব্যের জন্য পুরো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিষোদগার করলেও তা একইরকম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বলে বিবেচিত হবে। কোনোরকম অতিরঞ্জন ও মিথ্যাচার বা উসকানিকে যেমন প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, তেমনি সামগ্রিক বাস্তবতাকে স্বীকার না করে বা সত্যকে আড়ালে রেখেও সত্যিকারের সমাধান হবে না। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।