স্কুলের পরিবেশ বাচ্চাদের পরিচিত এবং বন্ধুসুলভ করা হয়েছে: মজিদ রিয়াজ

আমরা ‘আর্কিগ্রাউন্ড’ মনে করি যেকোনো স্থাপত্য মাটিতে জন্মানো একটি গাছের মতো। এই বিশাল পৃথিবীর বুকে কোথাও কোনো গাছ সুন্দর ও সাবলীলভাবে জন্মাবে, সেটা নির্ভর করে সেই অঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর। ঠিক তেমনি একটি স্থাপত্য কেমন হবে সেটি সেই অঞ্চলের আবহাওয়া, জলবায়ু, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপনের ধরন এবং ওই অঞ্চলের সহজলভ্য নির্মাণসামগ্রী দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাই মানুষের তৈরি স্থাপত্য এবং প্রকৃতি যুগপৎভাবে সহাবস্থানে থাকবে। 

বর্তমান সময়ে আমাদের স্থাপত্য অনেকটাই পশ্চিমা স্থাপত্যরীতি দ্বারা প্রভাবিত। তাই বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের স্থাপত্যে বাংলাদেশের স্থাপত্য, জলবায়ু এবং জীবনযাপন প্রতিফলিত হয় না। আমরা চেষ্টা করছি, আমাদের দেশের জলবায়ু এবং মানুষের জীবনযাপনকে প্রাধান্য দিয়ে, সমসাময়িক বিশ্বের স্থাপত্য মঞ্চে বাংলাদেশের নিজস্ব স্থাপত্যরীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

চাঁদপুরের ‘শাহাবুদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ’র কাজটা শুরুর আগে আমি যখন জায়গাটা দেখতে যাই, তখন গাছপালায় ঘেরা সবুজ জমিটা দেখে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেই, এখানে যে স্থাপত্যই হোক, সেই ভবনের উপস্থিতি যেন এই সবুজ জায়গটাকে শাসন না করে। ভবনের উপস্থিতি খুব জোরালো না হয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাবে। এই ভবনের দেয়ালের রং অনেকটা মাটির রং রাখার চেষ্টা করেছি।

তারপর চিন্তা করি, যারা এই স্কুলে পড়বে, সেসব বাচ্চা কীভাবে কোন পরিচয়ে বড় হয়েছে তা নিয়ে। আমি চাইনি যে বাচ্চাগুলো একটা অপরিচিত বা বিচ্ছিন্ন পরিবেশে স্কুলে পড়তে আসুক। গ্রামের বাচ্চারা যেভাবে মাটির কাছাকাছি থেকে সবুজের মধ্যে বড় হয়েছে, বিদ্যালয়ে এসে যেন সে একই পরিবেশ পায়, সেটা মাথায় রেখে কাজ করা হয়েছে।

স্কুলের বাচ্চারা অধিকাংশই একতলা ঘরে থেকে অভ্যস্ত। তাই ভবনটি দোতলা করা হলেও, দোতলাকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে মাটির ও গাছের সঙ্গে সার্বক্ষণিক একটা জোরালো সম্পর্ক থাকে।      

একতলা একটি ঘরের চারপাশ দিয়ে যেমন হাঁটাচলার একটা জায়গা থাকে, তেমনি দোতলার ক্লাসরুমগুলোর চারদিকে প্রশস্ত করিডর এবং ভবনের চারদিকে একটি ছোট বাগানের জায়গা রাখা হয়েছে।

ক্লাসরুমের দরজা-জানালাগুলো প্রথাগতভাবে না করে, কাঠ ও টিন দিয়ে একটা বড় রঙিন দেয়াল বানানো হয়েছে। এটাতে আমাদের দেশের গ্রামের প্রচলিত টিন ও কাঠের বাড়ির প্রতিফলন পাওয়া যায়।

রংগুলোকে বাছাই করা হয়েছে গাছের পাতার জন্ম থেকে ঝরে যাওয়ার পর পর্যন্ত যে রংগুলি দেখা যায় সেখান থেকে। গ্রামের একটা শিশুর কাছে এই রংগুলি খুবই পরিচিত। তাই তার অবচেতন মন এই রংগুলো অত্যন্ত বন্ধুসুলভভাবে গ্রহণ করবে।   

ভবনের প্রতিটি জিনিসই শিশুদের কোনো না কোনোভাবে পরিচিত। উদ্দেশ্য ছিল, স্কুলে এসে শিশু এমন কিছু না দেখুক যেটা তার পরিচিত মণ্ডলের বাইরে।

সব মিলিয়ে স্কুলের পরিবেশটা বাচ্চাদের জন্য পরিচিত এবং বন্ধুসুলভ করার চেষ্টা হয়েছে। ক্লাসরুমের সামনে দরজা-জানালার সঙ্গে বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেটা আমরা আমাদের গ্রামের অনেক বাড়ির প্রবেশ দরজার সঙ্গে দেখি।

আমি মনে করি, পরিবেশের সঙ্গে ভবনের দৃঢ় সম্পর্ক বাচ্চাদের পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা বাড়াবে।

ভবনের বাইরে খোলা আকাশের নিচে একটি ছুটির সিঁড়ি দেওয়া হয়েছে। সিঁড়িটি দোতলা ও মাঠের মাঝে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে দোতলাকে মাটির কাছে নিয়ে এসেছে।

বাচ্চাদের কাছে সিঁড়িটি হলো একটা খেলার সরঞ্জামের মতো। তাই ছুটির সিঁড়িটির তলা প্রবেশগম্য করা হয়েছে। ছুটির সিঁড়িটি কোনো বাঁক ছাড়া সোজা নিচে নেমে এসেছে। শিশুরা ছুটির সময় ঘণ্টার শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে হই-হুল্লোড় করে এই সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমে বাড়ির পথ ধরবে।

ভবনের দোতলার ছাদে দোচালা টিনের চালা দেওয়া হয়েছে। যেখানে আমাদের দেশের গ্রামীণ স্থাপত্যের প্রতিফলন পাওয়া যায়। আমাদের দেশে জলবায়ুগত কারণে দোচালা ব্যবহার করা হয় যা রোদ ও বৃষ্টি থেকে ভবনের দেয়ালকে রক্ষা করে।

নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ইট, বালি, সিমেন্ট, লোহা, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি যা স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য তা-ই ব্যবহার করা হয়েছে এবং নির্মাণকাজটি স্থানীয় নির্মাণকর্মী দ্বারা করানো হয়েছে। হয়তো কোনো নির্মাণকর্মীর সন্তানও এ স্কুলের শিক্ষার্থী হবে।

স্থাপত্যটি লক্ষ্মীপুরের বাচ্চাদের জন্য তৈরি। তাই এখানে লক্ষ্মীপুরের নির্মাণকর্মীদের যুক্ত করাটাই আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে।

স্কুলের পাশেই স্থানীয়দের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এবং মাঠের উত্তর পাশে একটি শহীদ মিনার বানানো হয়েছে। শহীদ মিনারের উঁচু বেদি ধাপে ধাপে মাঠ পর্যন্ত নেমে গেছে। এই ধাপগুলি বাচ্চারা মাঠে মাঝে মাঝে খেলা উপভোগের জন্য বসার স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।   

সাধারণত স্কুল প্রাঙ্গণ ছুটির পর সুনসান হয়ে যায় এবং মানুষের যাতায়াত না থাকায় অনেক ধরনের অপকর্মের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই আমি চেয়েছি, স্কুলটির সঙ্গে মসজিদ ও খেলার মাঠের যেন সার্বক্ষণিক মানুষের যাতায়াত থাকে এবং বিদ্যালয় চত্বরকে সাধারণ মানুষ যেন নিজেদের আপন করে নেয়।

জনসাধারণের জন্য তৈরি স্থাপত্য জনসাধারণের জন্যই উন্মুক্ত থাকুক, তাহলেই স্থানীয় জনসাধারণ এর যত্ন নেবে।

গ্রামের ছোট ছোট সবুজ বাচ্চাগুলো সবুজের মাঝে থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করুক, বিদ্যালয় থেকে, শিক্ষাগ্রহণ করুক প্রকৃতি থেকে স্থাপত্য হিসেবে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অবদান।

লেখক:  স্থাপত্য শিল্পী