আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার ও ভুয়া আমদানি-রপ্তানির নামে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া প্রতিরোধে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকে সরকার নিযুক্ত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্মগুলোর চাহিদা অনুযায়ী ফাইল সরবরাহ করছে না ব্যাংকগুলো। এ বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়ে ফার্মগুলো বলেছে, ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে না। এতে বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাংক অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালের ঋণ ও অগ্রিমের বাস্তব অবস্থা, ওই তিন বছরের মূলধনী যন্ত্রপাতি, সহায়ক সামগ্রী, কাঁচামাল, মজুদ ও খুচরা যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য যেসব ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ দিয়েছে তার প্রতিটির আমদানিকারক ও আমদানিভিত্তিক বিবরণ প্রণয়ন করতে বিশেষ নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর সময়ে ব্যাংকের রপ্তানিকারক ও রপ্তানিভিত্তিক বিবরণ, রপ্তানি বিল কেনা, রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়া, রপ্তানি ঋণ দেওয়া ও রপ্তানি বাবদ রাজস্ব আয়ের তথ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখার কথা ফার্মগুলোর।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনার আদেশ জারি করে পাঁচ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। উপসচিব মৃত্যুঞ্জয় সাহা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বিশেষ নিরীক্ষকদের দায়িত্ব পালনে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং দেশ থেকে অবৈধ পন্থায় টাকা পাচারের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নিরপেক্ষ অডিট (নিরীক্ষা) ফার্ম দিয়ে তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ বিশেষ অডিটের মাধ্যমে ব্যাংক অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মচারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে এবং সরকার ঘোষিত আর্থিক খাত সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম সংক্রান্ত ওয়ার্কিং কমিটিও গঠন করে মন্ত্রণালয়। গত ১৬ মে ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্মসচিব মু. শুকুর আলীর সভাপতিত্বে নিয়োগ পাওয়া সিএ ফার্মগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ফার্মগুলো বলেছে, নিরীক্ষা কাজে ফাইল দিয়ে সহযোগিতা করছেন না জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে ব্যাংকগুলোর ফাইল সরবরাহে অনীহার তথ্য উঠে এসেছে, যার একটি কপি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের আমদানি নিরীক্ষাকারী ফার্ম হাওলাদার ইউনুস অ্যান্ড কোং জানায়, অগ্রণী ব্যাংকের
কিছু কিছু শাখা সিএ ফার্মগুলোকে এলসি (ঋণপত্র) ফাইল হস্তান্তরে অনীহা প্রকাশ করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষ নিরীক্ষা দলকে ফাইল না দেওয়ার কোনো কারণ নেই। অবশ্যই তাদের কাজে সহযোগিতার অংশ হিসেবে সব ফাইল সরবরাহ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সকল শাখা থেকেই সব ফাইল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফার্মগুলোও ভালোভাবে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’
এমজে আবেদিন অ্যান্ড কোং’র প্রতিনিধি বলেছেন, জনতা ব্যাংক থেকে তারা ৩৫৫টি ফাইল পেয়েছেন। তবে ব্যাংকটির লোকাল অফিসে এলসি ফাইল রয়েছে ২৫৫টি। কিন্তু লোকাল অফিস থেকে ৩০টি ফাইল সরবরাহ করা হয়েছে। ফাইল না দেওয়ায় নিরীক্ষা কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিস ও জনতা ভবন করপোরেট শাখার কোনো তথ্য পায়নি এস এফ আহমেদ অ্যান্ড কোং’র নিরীক্ষকরা। তাই এই দুই শাখার বদলে অন্য পাঁচটি শাখার নিরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছেন তারা। বৈঠকে উপস্থিত জনতা ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ওই দুই শাখার তথ্য সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছেন। হুদাভাসী অ্যান্ড কোং’র প্রতিনিধি সভায় জানান, রূপালী ব্যাংক লোকাল অফিসের ২৫০টি এলসি ফাইলের মধ্যে ৮৬টি ফাইল হস্তান্তর করেছে। ছয়টি শাখার কোনো তথ্য পায়নি সিএ ফার্মটি।
এ বিষয়ে কথা বলতে জনতা ব্যাংকের সিইও ও এমডি মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ এবং রূপালী ব্যাংকের এমডি মো. আতাউর রহমান প্রধানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়ে ও এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মৃত্যুঞ্জয় সাহা বলেন, ‘জনতা ব্যাংকের আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রে নিরীক্ষা কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। এ বিষয়টি শাখা পর্যায়ে সমাধানের জন্য অতি সত্বর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, কোনোভাবেই কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।’ শাখা পর্যায়ে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নিরীক্ষা ফার্মগুলো কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ডিএমডিকে তা জানাতে পরামর্শ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ব্যাংকগুলো ফার্মগুলোকে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিটি শাখা পর্যায়ে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করে তা মন্ত্রণালয়কে জানাতে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি মু. শুকুর আলী।
সোনালী ব্যাংকের রপ্তানি এলসি ফাইল নিরীক্ষা করছে রহমান রহমান হক নামের একটি ফার্ম। তাদের প্রতিনিধি মন্ত্রণালয়কে জানান, প্রাথমিকভাবে ৫০০টি ফাইলের কথা বলা হলেও বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ফাইল সংখ্যা ৭০০-এর বেশি, বিলের সংখ্যা ৪০০০-এর বেশি। এ বিবেচনায় সব এলসি ফাইল নিরীক্ষা শেষ করতে তাদের ৭-৮ মাস সময় লাগবে। এ কাশেম অ্যান্ড কোং ফার্ম নিরীক্ষা করছে বেসিক ব্যাংকের আমদানি সংক্রান্ত এলসি ফাইলগুলো। ব্যাংকটির ফাইলের সংখ্যা ১০০-এরও কম জানিয়ে ফার্মটির কর্মকর্তারা জানান, ২-৩ মাসের মধ্যে তাদের নিরীক্ষা শেষ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আমদানি-রপ্তানির সময় পণ্যমূল্য হেরফের করেই পাচার হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আমদানি-রপ্তানির তথ্য চাওয়া হয়েছে অর্থপাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, ব্যবসায়ীরা আমদানিতে বেশি মূল্য ও রপ্তানিতে কম মূল্য ঘোষণা করে অর্থপাচার করে থাকে। অনেক সময় আমদানি না করেও মূল্য পরিশোধ করা হয়। রপ্তানি না করেই অনেকে নগদ সহায়তা তুলে নিচ্ছে। ব্যাংকের এলসি ফাইলের তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হবে।