গৎবাঁধা সমাধানে শান্তি আসবে না ইয়েমেনে

বর্তমান বৈরিতার কথা বাদ দিলেও ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। আরব বসন্তের সময় কিছুদিনের জন্য ইয়েমেনকে সাফল্যের এক নজির হিসেবে বাহবা দেওয়া হলেও দেশটি অল্পদিনের মধ্যেই গ্যাঁড়াকলে পড়ে যায়। ক্ষমতা সংহত করা আর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে নতুন নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণেই তা ঘটে। গত ছয় দশক ধরেই এ সমস্যাটি বারবার ফিরে আসছে ইয়েমেনে।

 

ইয়েমেনে সংঘাতের অন্তত চারটি পৃথক কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত অঞ্চল রয়েছে। উত্তরে হুতি ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে যুদ্ধ, দক্ষিণে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে লড়াই, দক্ষিণ-পূর্বে দায়েশ (আইএস) ও আল-কায়েদার আরব উপদ্বীপ শাখার (একিউএপি) বিক্ষিপ্ত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই আর তায়েজ ও হুদাইদা বন্দরের দখলের জন্য যুদ্ধ। প্রতিটি অঞ্চলে রয়েছে আলাদা পক্ষ, কৌশল আর লক্ষ্য। এ  থেকে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইয়েমেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ সমজাতীয় নয়। আর একইভাবে বলা যায়, সমাধানটাও একরকম হবে না। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য ইয়েমেনিরা কয়েকবারই আলোচনায় বসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১১ সালের উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল (জিসিসি) এর উদ্যোগ, ২০১৩ সালের ন্যাশনাল ডায়ালগ কনফারেন্স এবং ২০১৮ সালের স্টকহোমের চুক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে কিছুই এগোয়নি। ধসে পড়েছে ইয়েমেনের অর্থনীতি আর জাতীয় অবকাঠামো। পরিণতিতে শুরু হয়েছে নিরন্তর সহিংসতা আর রাজনৈতিক অস্থিরতার এক বিপজ্জনক চক্র। সংশ্লিষ্টরা এ সংঘাতের নেহাতই এক দ্বিমুখী বয়ানে অনড় হয়ে থাকায় সমাধানের কৌশলগুলো কার্যকর হচ্ছে না। ইরানকে একমাত্র ‘মন্দ লোক’ চিহ্নিত করে নেওয়া কৌশল এ সংকটের জটিল বহুমাত্রিকতাকেই অস্বীকার করে। এছাড়া এটি ইয়েমেনি নেতৃত্বকে সংঘাতের দায়দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দেয়।

 

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হস্তক্ষেপের লক্ষ্যগুলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২১৬ নম্বর প্রস্তাবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ওই প্রস্তাবে ‘সামরিক হস্তক্ষেপসহ প্রয়োজনীয় সব উপায়ে’ আরব দেশগুলোর সমর্থন কামনা করা হয়েছে। এতে হুতি বিদ্রোহীদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘ইয়েমেনের বৈধ সরকারের কর্তৃত্বের’ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদিরা ওই অঞ্চলে ইরানি প্রভাবের বিরোধী জোটকেও প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবেশী দেশটিতে শিয়া হুতিদের উত্থানে সুন্নিপ্রধান সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। সৌদি আরব তার ঘাড়ের কাছে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে রাখঢাক করেনি।

 

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা চালানোর জন্য ইরান ও তার সমর্থকদের নিন্দা করেছেন। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইয়েমেন সীমান্তের কাছে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আবহা বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার প্রসঙ্গে ওই প্রতিক্রিয়া জানান পম্পেও। ইরানকে মোকাবিলার লক্ষ্যে তিনি সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং এশীয় ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে বৈশ্বিক জোট গঠনে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উদ্যোগ। তখন থেকে ইয়েমেনে সংঘাত বেড়েছে। উত্তেজনা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ইয়েমেন ও বৃহত্তর অঞ্চলে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলাও চলতে থাকবে। বিশেষ করে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনায়।

এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আর ইয়েমেনি সরকার একই পথ ধরলে সৌদি আরবের নমনীয় হওয়া ও বৈরিতা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে। এতে করে সহিংসতা আর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাই বাড়বে, যা কিনা অনেকের প্রত্যাশার ঠিক বিপরীত ঘটনাই জন্ম দেবে। আর তা হচ্ছে ইরানের প্রভাব আরও বৃদ্ধি। ইয়েমেনের যুদ্ধ হচ্ছে ইরানের জন্য কম খরচে অনেক ফায়দা পাওয়ার এক কায়দা। দেশটির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীকে অস্বস্তিতে ফেলার সহজ উপায়। এছাড়া বাইরের সব তরফ থেকে অব্যাহত হস্তক্ষেপ ইয়েমেনিদের নিজেদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের কোনো উপায় রাখবে না। হুতি এবং ইরানি স্বার্থের সমন্বয় করাও আরেক সমস্যা। হুতিদের কৌশলের ওপর ইরানের প্রভাব সীমিত। এ কারণে উভয়ের স¡ার্থের সমন্বয় করা সহজ নয়। ইরান হুতি গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যেই সামরিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। ইরান ও ইয়েমেনের হুতিরা শিয়া ইসলামের পৃথক দুটি শাখা অনুসরণ করে। তাদের সহযোগিতার ভিত্তিও ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার ওপরই দাঁড়িয়ে। হুতিদের স্বার্থ এবং উদ্বেগগুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে নাÑ এ মর্মে তাদের আশ্বস্ত করতে চাইলে কূটনৈতিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি।

 

ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথটি হবে দীর্ঘ এবং কঠিন। আর শান্তির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো প্রথমে এ সংকটের স্বরূপটি বুঝতে পারা। এর গভীরভাবে বিভক্ত বিভিন্ন ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক দিক রয়েছে। স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো একে করে তুলেছে আরও জটিল। সমস্যাটি যেমন একমাত্রিক নয়, তেমনি এর কোনো একক সরল সমাধানও নেই। ইরানকে একমাত্র মন্দ লোক হিসেবে চিহ্নিত করলে হিতে বিপরীতই হবে। তা এ অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতিমধ্যেই গুরুতর রূপ নেওয়া মানবিক সংকট তাতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এটি ইয়েমেনে বিদেশি হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখাকেও উৎসাহিত করতে পারে। বিদেশিদের হস্তক্ষেপ দীর্ঘায়িত হওয়া যেমন একটি ব্যাপক ও সমন্বিত শান্তিচুক্তির সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করবে না, তেমনি কয়েক দশক ধরে ইয়েমেনি সমাজকে কুরে কুরে খাওয়া গভীর সমস্যাগুলোরও সমাধান দেবে না। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, ইরান নয়, বরং ইয়েমেনি জনগণই এই ত্রুটিপূর্ণ কৌশলের মারাত্মক পরিণতির একমাত্র শিকার হবে।

 

শান্তির জন্য টেকসই রাস্তা তৈরি করতে হলে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক নেতাদের অবশ্যই এই আবহগুলোকে সম্যকভাবে বুঝতে হবে। ইয়েমেনের পরিস্থিতি বিভিন্ন কারণ এবং প্রভাবগুলোর একটি সমন্বিত ফল, যার ব্যাপারে প্রচলিত গৎবাঁধা সমাধানগুলো অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় ব্যাপক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবে সংঘাতটির বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ, ব্যাপক ধারণা ও বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য ইয়েমেন সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল তা সম্ভব হবে। এর অর্থ হচ্ছে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রধান দায়িত্বটি নিতে হবে ইয়েমেনি সরকারকেই। ইয়েমেনের নেতৃত্ব যদি একই পথে চলতে থাকে তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইয়েমেনের লাখো নাগরিক যাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো কোনোদিনই শান্তি চোখে দেখবে না।

 

লেখক : নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক

খালিজ টাইমস থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আবু ইউসুফ