দুদিন হলো ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কলাভবনে বিভাগের অফিস কক্ষে ঢুকতে পারছি না। বিশ^বিদ্যালয় থেকে সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভবনের প্রবেশপথে তালা লাগিয়ে দিয়েছে একদল শিক্ষার্থী। শুধু তা-ই নয়, পাহারাও বসিয়েছে যেন কেউ ঢুকতে না পারে ভেতরে। বিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি কখনো, আন্দোলনের অংশ হিসেবে আর যা-ই হোক, শিক্ষকদের অফিস কক্ষে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়নি। তবে দিন বদলাচ্ছে, বদল হচ্ছে আন্দোলনের কৌশলও। হরতাল, ক্লাস বর্জনের ডাকে আজকাল আর কেউ সাড়া দেয় না। তাই বাধ্য হয়েই নতুন কৌশল খুঁজে বের করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাদের দাবি, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়াতেই এই পথে হাঁটতে হচ্ছে তাদের। কেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল? ঢাকা শহরের সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে ফিরিয়ে আনার কারণে? এর ফলে নাকি তাদের ক্লাস-পরীক্ষা-ফলাফল প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, প্রশাসনিক ভবনে হাঁটার উপায় নেই আর সবচেয়ে বড় কথা, ‘পরিচয়ের সংকট’ তৈরি হয়েছে তাদের, কলেজের ছাত্ররাও নিজেদের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে দাবি করছে!
অন্যদিকে, সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন করছে, মূল দাবিটা তাদেরও একই, অধিভুক্তি বাতিল। কারণ? ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকে তাদের নাকি জীবন অতিষ্ঠ, সেশনজট থেকে মুক্তি আর শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়েছে কলেজগুলো, কিন্তু সেশনজট তো কমছেই না, উল্টো রাতারাতি তাদের পরীক্ষার ফলে ধস নেমেছে, গণহারে ফেল করছে শিক্ষার্থীরা। এ থেকে বাঁচার একটাই উপায়, অধিভুক্তি বাতিল।
দুই. ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য বলেছেন, অধিভুক্তি বাতিলের ক্ষমতা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের নেই। সমালোচনা হচ্ছে সেটা নিয়েও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক প-িতরা দেখিয়ে দিচ্ছেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ অনুসারে কোনো কলেজের অধিভুক্তি বা অধিভুক্তি বাতিলের ক্ষমতা বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্র্তৃপক্ষ, সিন্ডিকেটের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকার চাইলে সংসদে আইন করে ওই অধ্যাদেশের কোনো ধারার পরিবর্তন করতে পারে, সেই পদ্ধতিতেই ১৯৯০ সালে আইন করে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাধারণ শিক্ষা কলেজগুলোকে। তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়েছিল যথাযথ প্রক্রিয়ায়, সরকারি নির্দেশনা নিয়ে সিন্ডিকেট ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে আলোচনা করে, তাই তখন তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে যেই শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ছিল, তাদের ডিগ্রি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনেই শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে পাঠক্রম, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত সবকিছুর দায়িত্ব পেয়েছিল জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়। কিন্তু এই সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি মোটেই সে রকম ছিল না। একেবারে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্তটি চাপিয়ে দেওয়া হয়, বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই। শুধু তা-ই নয়, দুই বিশ^বিদ্যালয়ের জিদের কারণে যেসব ছাত্র জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে নিবন্ধিত হয়ে অনার্স চতুর্থ বর্ষের লিখিত পরীক্ষা পর্যন্ত দিয়ে ফেলেছে, তাদের শুধু মৌখিক পরীক্ষাটুকু বাকি
থাকতে নিয়ে আসা হয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে। বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত পাঠক্রম অনুসরণ না করেই শুধু একটি মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে তারা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সনদ পেয়ে যায়। এদের প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সবই হয়েছে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের পাঠক্রম অনুসারে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন মূলত কলেজের শিক্ষকরাই এবং সেই মূল্যায়নে বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যান্য পরীক্ষার মতোই খুব ভালো গ্রেড পেয়েছিল।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের শুরুটা এখান থেকেই। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা একটা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এই বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, প্রচলিত ধারণা অনুসারে দেশের সেরা শিক্ষার্থীরাই এই বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু এই বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ গ্রেড পান খুব কম শিক্ষার্থীই। আমাদের বিভাগের কথাই ধরা যাক, প্রতি বছর এখানে ১৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে পরীক্ষায় চারের মধ্যে ৩ দশমিব ৫ বা তার চেয়ে বেশি গ্রেড পায় হয়তো ১০ থেকে ১৫ জন। কিন্তু অধিভুক্ত সাতটি কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজারের আশপাশে। এদের মধ্যে শতকরা ১০ জনও যদি ওই গ্রেড পায়, সংখ্যাটা একশোর ওপরে চলে যাবে। আর সেটা চোখে পড়তে বাধ্য। তখন তাদের মনে হতেই পারে, আমরা ‘মেধাবী’ হয়েও ভালো ফল করতে পারছি না, কিন্তু কলেজের ‘পিছিয়ে পড়া’ শিক্ষার্থীরা বেশি নম্বর পাচ্ছে। এত দিন সেটা অন্য বিশ^বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন বলে একটা আত্মতৃপ্তির জায়গা ছিল, এখন তো সেটাও থাকছে না। একই বিশ^বিদ্যালয়ের সনদে এত পার্থক্য কেন থাকবে? ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমনিতেই আমরা একটা উচ্চমন্যতা ঢুকিয়ে দিয়ে রেখেছিÑ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সেরা, এখানে সেরা ছাত্ররাই ভর্তি হয়, কলেজে যারা ভর্তি হয়, তাদের চেয়ে এরা মেধায় অনেক এগিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই নাক-উঁচু ধারণা শুধু যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আছে, তা-ই নয়, আছে শিক্ষকদেরও অনেকের মধ্যে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে এই নাক-উঁচু ভাবটা খুব স্পষ্ট, নইলে আত্মপরিচয়ের সংকটের কথাটা তারা বলতেন না।
তিন. জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় নামের প্রতিষ্ঠানটির জন্ম ও বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াই আসলে এই সমস্যার মূলে। যুগে যুগে সারা পৃথিবীতেই বিশ^বিদ্যালয়ের কাঠামোতে অধিভুক্ত কলেজের স্থান স্বীকৃত। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে তো আরও বেশি করে স্বীকৃত। যে কারণে এ বিশ^বিদ্যালয়কে একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো তার একটি কারণ, অক্সফোর্ডের মতো করে সাজানো শিক্ষাপদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ছাত্ররা ভর্তি হয় একেকটি কলেজ বা হলের অধীনে। স্নাতক পর্যায়ে আসলে পাঠদানের দায়িত্বও কলেজের ওপরই থাকে, বিশ^বিদ্যালয়ের দায় উচ্চতর গবেষণা, মানসম্পন্ন পাঠক্রম তৈরি এবং পরীক্ষা গ্রহণ। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জন্মের আগে এই দেশের কলেজগুলো কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ছিল, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ডিগ্রিও অনুমোদন করত তারাই। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জন্ম হলে কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত কীভাবে এড়ানো যাবে, এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়েছিল ঢাকা শহরের চৌহদ্দির একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত স্কুল-কলেজগুলোর দায়িত্বই শুধু নেবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। শিক্ষা বোর্ড গঠনের পর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত এই দায়িত্ব বোর্ডের হাতে চলে যায়; ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ও আসলে এই ধরনের একটি শিক্ষা বোর্ড ছাড়া কিছু নয়। শুধু শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন আর পরীক্ষা গ্রহণ ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই। অনেক দিন পর্যন্ত এই বিশ^বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষকও ছিলেন না, পরে কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ করা হলেও তাদের সেভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি কোনো দিন। অন্যদিকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই এই বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত শত শত কলেজকে অনার্স পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ঢালাওভাবে। এসব কলেজে কারা ভর্তি হবে? সাত কলেজ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ফিরে আসার পর থেকে যতবারই কোনো কাজে কোনো কলেজে গিয়েছি, সব শিক্ষকের অভিন্ন সুর, আমাদের কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা তো আপনাদের বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো নয়, তারা দুর্বল, তাই তাদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অত কঠোর হওয়া যাবে না। কঠোর না হওয়ার অর্থ, মৌখিক পরীক্ষায় অন্তত কয়েকজনকে তো পঞ্চাশে চল্লিশের ওপর দিতেই হবে। কিছু পারুক আর না পারুক, নম্বর শুরু করতে হবে ত্রিশ থেকে। কলেজগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক কোর্সের জন্য বরাদ্দ ইনকোর্সের ২০ নম্বরের মধ্যে ১৫ বা এর নিচে পান খুব কম শিক্ষার্থীই, অথচ মৌখিক পরীক্ষার সময় তাদের শিক্ষকরাই নিশ্চিত করেন, এরা তো আসলে ক্লাস-টøাস সেভাবে করে না!
চার. ঠিক এই পরিস্থিতিটা বদলানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কলেজগুলোকে আবার দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। তখনই স্থির হয়, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকা কলেজগুলোকে পর্যায়ক্রমে আবার দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হবে। নব্বই দশকের শুরুতে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে যেমন ছিল, সেভাবে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হবে, সেই সিদ্ধান্তটাও নেওয়া হয় তখনই, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উভয় বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে। সেটা কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় হাতে ছিল। কিন্তু পরের তিন বছর এই দুটি বিশ^বিদ্যালয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি এ ব্যাপারে। জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় ব্যস্ত ছিল এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য দেন-দরবার আর নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের মরিয়া চেষ্টায়, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় স্রেফ উপেক্ষা করে গেছে বিষয়টা। তাই ২০১৭ সালে যখন সরকার থেকে সিদ্ধান্তটা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন প্রস্তুত ছিল না কোনো বিশ^বিদ্যালয়ই। তাই একটা জগাখিচুড়ি অবস্থার সূচনা হয়, পরের দুই বছরেও যেটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই দুই বছরে কী করেছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়? ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে আসার পর এখন পর্যন্ত দুটি ব্যাচ প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে, আরেকটির ভর্তির সময় চলে এসেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত বেশির ভাগ বিভাগ এই শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ কোনো পাঠক্রমই অনুমোদন করেনি। একেক বর্ষের জন্য পাঠক্রম প্রণয়ন করে জোড়াতালি দিয়ে চলছে কলেজশিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান প্রক্রিয়া। অথচ বিশ^বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য অনুসারে এই শিক্ষার্থীদের কিন্তু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো অভিন্ন পাঠক্রমই অনুসরণ করার কথা, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে সেভাবেই চলত সবকিছু, এমনকি পরীক্ষাও হতো অভিন্ন প্রশ্নে, একই দিনে। তাতে কলেজগুলোর কোনো অসুবিধা হতো না।
অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খাতা দেখলেই গণহারে ফেল! বাস্তবে হয়তো সত্যিই হচ্ছে সেটা। দুই কারণেই সেটা হতে পারে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাক-উঁচু মনোভাব তো আছেই, কিন্তু কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও কি কিছুটা দায়ী নন? নইলে কেন বারবার নিজেরাই এ কথা বলেন, তাদের খাতা মূল্যায়নটা ‘অন্যভাবে’ হওয়া দরকার? এটা কি কোনো যুক্তি হতে পারে? কলেজের শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি পাওয়ার জন্য ন্যূনতম নম্বর কেন পাচ্ছে না, সেটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে; তাদের উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করার উপায় খোঁজা যেতে পারে, কিন্তু তা না করে ডিগ্রি পাওয়ার যোগ্য না হলেও উদারভাবে খাতা মূল্যায়ন করে তাদের পাস করিয়ে দেওয়ার মতো ‘মামাবাড়ির আবদার’ নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে যাওয়া কেবল এ দেশেই সম্ভব। আর সেটা সম্ভব করার জন্য যে মানসিক দৈন্য থাকা দরকার, নিজেদের অযোগ্য ভাবার (এবং অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ডিগ্রি পাওয়াটাকে অধিকার ভাবার) সেই মানসিকতাটা ছাত্র-শিক্ষক উভয় পক্ষের মধ্যে গত তিন দশকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়।
তাই আমার কাছে মনে হয়, চলমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী আসলে বিবদমান দুই পক্ষের মানসিকতা। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের (এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও) নিজেদের ‘ব্রাহ্মণ’ আর অন্যদের ‘অস্পৃশ্য’ ভাবার উচ্চমন্যতা আর কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে নিচু ধারণা এবং সেই সামর্থ্যরে উত্তরণ না ঘটিয়েই শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি পাওয়াটাকে অধিকার ভাবা। এই মানসিকতা না বদলালে চলমান সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই।
লেখক
সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়