গত বছরের ডিসেম্বরে রাজধানীর হাজারীবাগের একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মারা যান পটুয়াখালীর নির্মাণশ্রমিক জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৫)। ভবনমালিক মোহাম্মদ আলী প্রথমে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি জাহাঙ্গীরের মরদেহ দাফনের জন্যও কোনো টাকা দেননি তিনি। পরে শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের চাপে ১ লাখ টাকা দিতে সম্মত হন মোহাম্মদ আলী। শ্রম আইন মোতাবেক ২ লাখ টাকা ও মরদেহ দাফনের জন্য আরও ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি জানান শ্রমিকনেতারা। ভবনমালিক রাজি না হওয়ায় হাজারীবাগ থানায় মামলা করেন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মিনারা বেগম। ৮ মাসেও চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ। এরই মধ্যে পলাতক অবস্থায় আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন আসামি মোহাম্মদ আলী।
ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) ও বাংলাদেশ নির্মাণ শ্রমিক লীগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর জাহাঙ্গীর আলমের মতো
সারা দেশে গড়ে ২৫০ জন নির্মাণশ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছেন। আহত হয়ে আজীবন পঙ্গু হয়ে যান চার শতাধিক শ্রমিক। নিজেদের পরিসংখ্যান তুলে ধরে নির্মাণ শ্রমিক লীগের এক নেতা জানান, ২০১৮ সালে সারা দেশে ২৮৩ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিহত হন। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে মারা গেছেন ৯৫ জন শ্রমিক। আহত হয়ে আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন শতাধিক।
এসব পরিস্থিতিতে আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিক ও তার পরিবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মালিকপক্ষ প্রশাসনের সহায়তায় পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যারা বেঁচে যাচ্ছেন তারা আজীবন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে, ৬৭টি অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশা রয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে অন্তত ২৭টি পেশা নির্মাণ খাতের। এসব পেশার মধ্যে রয়েছে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, টাইলস মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, গ্রিল মিস্ত্রি ইত্যাদি। এদের মধ্যে রং, রাজ ও রডমিস্ত্রির কাজ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত। ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন (ইনসাব) বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ। নির্মাণকাজে দুর্ঘটনায় ১৫ শতাংশ শ্রমিক মারা যান নির্মাণস্থলে উঁচু থেকে পড়ে, ৭ থেকে ৮ শতাংশ শ্রমিক মারা যান আগুনে পুড়ে ও চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিক দুর্ঘটনায় হাত-পা কেটে যাওয়া, আঙুল কেটে পড়ে যাওয়া বা এমন নানা মাত্রার অঙ্গহানির শিকার হন।
শ্রমিকনেতারা বলছেন, দুর্ঘটনায় নিহত কিংবা গুরুতর আহত শ্রমিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে মালিকের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে শ্রম আইনের দুর্বলতা আছে বলে মনে করেন তারা। কারণ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে নির্মাণশ্রমিকদের কোনো নিয়োগপত্র থাকে না। এ হিসেবে আদালতে প্রমাণ করার মতো কোনো কাগজ পেশ করা সম্ভব হয় না। তাই মামলা করেও সুফল পাওয়া যায় না। এজন্য দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবার মামলা না করে ভবনমালিকদের দেওয়া যৎসামান্য টাকা নিতে বাধ্য হন।
নির্মাণ শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবি সিদ্দিক মিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ আদায় এক বিরাট ট্র্যাজেডির ব্যাপার। মালিকপক্ষ সব সময় প্রভাব খাটিয়ে শ্রমিকদের ভয় দেখায়। অনেক মালিক আছে যারা লাশ নেওয়ার টাকা পর্যন্ত দেয় না। এটা আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে হয়েছে।’ দেশে ৩৮ লাখ নির্মাণশ্রমিকের মধ্যে আনুমানিক ৮০ হাজার ট্রেড ইউনিয়নভুক্ত জানিয়ে ইনসাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক নির্মাণশ্রমিকের বিপরীতে মাত্র কয়েক হাজার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নভুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যুর খবর আমরা পাই না। প্রশাসন ও মালিকপক্ষ ভয়ভীতি দেখিয়ে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয় না।’ শ্রম আইন যুগোপযোগী করা উচিত বলে মত দেন এই শ্রমিকনেতা।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিকরা তা মানতে চান না। নিরাপত্তাসামগ্রী কিনে দিতে গড়িমসি করেন। এতে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন তারা। আব্দুল কাদের নামে একজন রংমিস্ত্রি জানান, ২০ বছরের কর্মজীবনে তিনি অন্তত ১০টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা দেখেছেন। তার তথ্য অনুযায়ী, রংমিস্ত্রিরা ৮-১০ তলা ভবনের বাইরে ঝুলে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত পা পিছলে পড়ে যান। একটি দড়ি দিয়ে ৩ দিনের বেশি কাজ করার নিয়ম না থাকলেও মালিক দড়ি কিনে না দেওয়ায় অনেক দিন কাজ করতে হয়। এতে দড়ি ছিঁড়ে মৃত্যু ঘটে শ্রমিকদের।
রাজ ও রডমিস্ত্রিরা জানিয়েছেন, নির্মাণাধীন কোনো স্থাপনার ছাদ ধসে পড়ে, অনেক উঁচুতে ঝুলন্ত অবস্থায় কোনো সেফটি গার্ড না থাকার কারণে দড়ি ছিঁড়ে পড়ে মারা যান অনেকে। এ ছাড়া নিচ থেকে মালামাল রশি দিয়ে বেঁধে ওপরে তুলতে গিয়ে পড়ে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। মুহাম্মদ সেলিম নামে একজন রাজমিস্ত্রি বলেন, ‘অনেকে কয় রাজমিস্ত্রির কাম সহজ। মালিকে পচা বাঁশ দিয়া মাচা বান্দায় দেয়, ভাইঙ্গা পইড়া বহু লোক মরে। বাইচা থাকলে তো আরেক মরণ আজীবনের জন্য পঙ্গু।’
এদিকে কয়েকজন ভবনমালিক দাবি করেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহারের তাগাদা দেওয়া হলেও তারা মানতে চান না। রংমিস্ত্রিরা হ্যান্ড গ্লাভস, বুট, হেলমেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী ছাড়াই কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। এ ছাড়া নির্মাণকাজে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।