জনস্বার্থে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অর্জন

বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান জনস্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম তার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কেনাকাটায় দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনকে ঘিরে। গত ১৬ মে ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে দেশ

রূপান্তরের প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সারা দেশে যে তুমুল আলোড়ন শুরু হয়েছিল; উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্তের মধ্য দিয়ে মাস দুয়েকের মধ্যেই একটি ইতিবাচক ফল পাওয়া গেল। বহুল আলোচিত রূপপুর প্রকল্পে কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ১৬ কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে আরও ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি চলছে এই প্রকল্পে কাজের অতিরিক্ত বিল হিসেবে পরিশোধ করা ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ৯ হাজার টাকা সরকারের অনুকূলে ফিরিয়ে আনা এবং অনিয়মে জড়িত তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও।

 

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে সুনির্দিষ্টভাবে ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশের জন্য দেশ রূপান্তরকে অভিনন্দন জানান। একইসঙ্গে এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখা অন্যান্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এ সময় মন্ত্রী গণমাধ্যমকে উদ্দেশ করে বলেন, সমালোচনা করার মতো ক্ষেত্র থাকলে তা তুলে ধরুন, সেটাই হতে পারে সরকারের পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী আরও বলেন, দোষীদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা ‘দুর্নীতিকে না বলার জন্য জিরো টলারেন্সের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত’ হয়ে থাকবে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে আমলে নিয়ে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ধন্যবাদের দাবিদার।

 

দেশ রূপান্তরের আলোচ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবনগুলোর জন্য প্রতিটি বালিশ কেনা হয়েছে ৬৬৭৫ টাকায় আর সেসব বালিশ ভবনের বিভিন্ন তলায় উঠাতে খরচ করা হয়েছে ৭৪০ টাকা করে। একইভাবে ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ড্রেসিং টেবিল, ইলেকট্রিক কেটলি, ইলেকট্রিক আয়রন, রুম ক্লিনার ও চুলা অস্বাভাবিক দামে কেনা এবং সেগুলো ভবনে তোলার অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়টি উঠে আসে ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ২০ মে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী রূপপুর প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জনস্বার্থে রিট দায়ের করেন। পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং অনিয়মরোধে কিছু সুপারিশ করে। এর মধ্যেই উচ্চ আদালত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই গত ১৫ জুলাই মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। ২৪ জুলাই অনিয়মে জড়িত ১৬ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং অন্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়।

 

বাস্তবিক অর্থেই গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, বিচার বিভাগের

আন্তরিক তাগিদ এবং সরকারের নির্বাহী বিভাগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা একত্রে মিলিত হলে, জনস্বার্থ রক্ষা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অর্জনের পথে যা করা সম্ভবÑ তারই একটা দৃষ্টান্ত দেখা গেল রূপপুর প্রকল্পের কেনাকাটায় অনিয়মের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণের মধ্য দিয়ে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব সময় এমনটাই আশা করা হয়ে থাকে। আমরা আশা করব, এই দৃষ্টান্তকে আমলে নিয়ে নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম নিজ নিজ দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাবে।

 

সব সমাজ ও রাষ্ট্রেই নানামুখী চ্যালেঞ্জ এবং চাপের মধ্যেই সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানেও কিছু সংবাদমাধ্যম আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকরা ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন। এই বাস্তবতাতে ‘দায়িত্বশীলদের দৈনিক’ কথাটিকে সেøাগান করে মাত্র আট মাস আগে যাত্রা শুরু হয় দেশ রূপান্তরের। আমরা মনে করি, বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে গেলে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জনস্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।